মন্তেশ্বরে ফের এক কৃষক আত্মঘাতী হলেন ঋণের ফাঁসে। মন্তেশ্বর থানার বামুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত কৃষকের নাম মানিক মাঝি(৪১)। মৃতদেহ উদ্ধার করে মন্তেশ্বর থানার পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য কালনা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এদিন সেখানেই মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হয়। দুই কন্যার মধ্যে ছোট কন্যা এবং স্ত্রী নমিতা মাঝি এদিন মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করার সময় কালনা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। নমিতা মাঝি জানান, ‘‘ঋণ করে এবার দু বিঘা জমি ঠিকা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু শিলাবৃষ্টিতে ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। তার উপরে ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় উচ্চ সুদে ৫০ হাজার টাকা স্থানীয় মহাজনদের থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। চাষ ও মেয়ের বিয়েতে বাজারে ঋণ হয়ে গিয়েছিলেন। শেষে আসল তো দূরে থাক, প্রতি মাসে যে সুদ হয় সেটাই মেটাতে পারছিলেন না। তাই কয়েকদিন আগে তিনি পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে কেরালায় কাজ করতে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেখানেও তেমন কিছু না করতে পারায় তিন দিন আগে বাড়ি ফিরে আসেন।’’
কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মৃত কৃষকের পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড় মেয়েকে নিয়ে তার স্ত্রী মন্তেশ্বর হাসপাতালে ছিলেন। ছোট মেয়ে ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। বাড়িতে একাই ছিলেন মানিক মাঝি। এদিন সকালে মাঠে বেরিয়ে যান। তারপরেই স্থানীয়রা কৃষকের ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান মাঠের মধ্যে একটি বাবলা গাছে। পুলিশকে খবর দিলে মৃতদেহ উদ্ধার করে কালনা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।
ঘটনা প্রসঙ্গে সারা ভারত কৃষক সভার পূর্ব বর্ধমান জেলা সম্পাদক সুকুল সিকদার বলেন, ‘‘কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যূনতম দাম পাচ্ছেন না। ফলে দিন দিন তাঁরা ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন। তার উপরে গ্রামে গ্রামে কৃষি উন্নয়ন সমিতিগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে জায়গা করে নিয়েছে মাইক্রো ফিনান্স কোম্পানিগুলি। কৃষকদের অবস্থার সুযোগ নিয়ে এই সংস্থাগুলি উচ্চ সুদে কৃষকদের ঋণ দিচ্ছে। সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে কৃষকরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা এই নিয়ে প্রথম থেকে আন্দোলন করে আসছি। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে কৃষকের স্বার্থে সেই আন্দোলনকে আরো উচ্চস্থানে নিয়ে যাব।’’
পূর্ব বর্ধমান জেলার শুধু কালনা মহকুমায় নয়, গোটা জেলা জুড়ে ঋণের ফাঁসে কৃষক। আমন ধান, আলু কোন চাষেই কথা রাখেনি রাজ্য সরকার। আমন ধান ওঠার সময় গরিবব কৃষক যারা মহাজনের কাছে দাদন নিয়ে চাষ করেছে, তাঁদের অভাবী বিক্রি করতে হয়েছে। সরকার সরাসরি ছোট, মাঝারি কৃষকদের কাছে ধান না কিনে ফড়ে, মিল মালিকদের কাছে ধান কেনার ফলে কৃষকরা সরাকরী সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেননি। আলুর ক্ষেত্রেও সরকার ৯০০ টাকা কুইন্টাল দরে আলু কিনবে কৃষকদের কাছ থেকে ঘোষণা করেছিল কিন্তু সেই আলু সাধারণ কৃষক বিক্রি করতে পারেননি। তৃণমূলের নেতা, কর্মীরাই আলুর টোকেন পেয়েছে। এবারে আলু চাষে সার, বীজ, জল, বস্ততা চড়া দরে কিনে আলুর দাম পেলো না চাষী। মাঠে ১০০-১২০ টাকা ৫০ কেজি আলুর দাম তাও গরজে বিক্রি। হাজার হাজার কৃষক এবছর আলু চাষ করে নিস্ব হয়ে পড়েছেন।
কৃষক সভার নেতা সমর ঘোষ বলেছেন, এবারের নির্বাচনে কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়া এটা একটা বড় ইস্যু পূর্ব বর্ধমান জেলা জুড়ে বামফ্রন্টের প্রার্থীদের একাধিক গ্রামে প্রচারে গিয়ে আলু চাষীর আর্তনাদ আর যন্ত্রনার কথা শুনেছেন। পূর্ব বর্ধমানে ধান ও আলু প্রধান অর্থকারী ফসল। সেই আলু চাষই সর্বনাশ ডেকে এনেছে চাষীদের। আলুর দাম নেই, সারের দাম অগ্নিগর্ভ, হিমঘরে আলু রাখার জন্য টোকেন কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছে শাসকদলের নেতাদের। তৃণমূলের রাজত্বে কৃষক, খেতমজুর, অসংগঠিত শ্রমিক সাধারন মানুষ কেউ যে ভালো নেই তা ভোটের প্রচারে বেড়িয়ে সিপিআই(এম) প্রার্থীদের নজরে পড়েছে।
এর আগেও কয়েক শত কৃষক ফসলের দাম না পেয়ে ঋণের ফাঁসে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন কিন্তু সরকার বা মুখ্যমন্ত্রী এর দায় নেয়নি, স্বীকারও করেনি। গত ১৫ বছরে ধান ও আলু চাষে কৃষক আত্মহত্যার মিছিল দেখেছে পূর্ব বর্ধমান। কৃষক নেতারা আশঙ্কা করছেন আলুতে মারাত্মক লোকসানের কারনে এই আত্মহত্যা আরো বাড়বে যদি সরকার কৃষকদের পাশে না দাঁড়ায়।
Comments :0