চার বছরের শিশুপু্ত্রের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভোরবেলায় আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ট্রমা কেয়ারের লিফট দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলো বাবার। কোথায় ছিলেন লিফটম্যান? দিনের পর দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধসে পড়ছে পরিকাঠামো। আর জি করের মতো বড় মাপের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাপাতালে কেন নিয়মমাফিক পরিকাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণ এবং তদারকির বন্দোবস্ত থাকবে না? এই সেই আরজি কর হাসপাতাল যেখানে ছাত্রী-চিকিৎসক অভয়ার খুন ধর্ষনের নারকীয় ঘটনয়ায় কেঁপে উঠেছিল এই রাজ্য, দেশও।
সেই আর জি করে ফের বেআব্রু হয়ে পড়ল বেসামাল, ভগ্নদশা পরিকাঠামোর রাজ্যেরই ছবি। যথারীতি চুপ মুখ্যমন্ত্রী। বলাই বহুল্য তাঁর প্রতিক্রিয়া মেলা ভার!
সরকারি হাসপাতালের ভিতরে দুর্নীতির শিকড় কত গভীরে তা ২০২৪’র আগস্টের অভয়া কাণ্ড সামনে এনেছিল। সরকারি হাসপাতালের সরঞ্জাম কেনা, এমনকি মর্গ থেকে দেহ পাচার, টেন্ডার দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই ও ইডি’র তদন্তও চলছে। নিষ্ফলা তদন্ত। অভয়া কাণ্ডেই আর জি করের পরিকাঠামো, নিরাপত্তা নিয়ে একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু কোথায় কী? রাজ্যে পরিকাঠামোর কি নিদারুণ চেহারা তা আরও একবার সামনে এল এমন একটি মর্মান্তিক ভয়াবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু শুধু কী এখানেই, শুধু আর জি করে? রাজ্যে এমন কোনও ক্ষেত্র আছে কী যেখানে বিন্দুমাত্র ভরসা রাখা যায়? ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে গোটা রাজ্যটাই।
এও এক মর্মান্তিক সমাপতন। যেদিন সংবাদপত্রের পাতায় এই প্রাতিষ্ঠানিক খুনের নিদারুণ শোকবার্তা, সেদিনই বহু সংবাদপত্রে মমতা ব্যনার্জির ছবি সংবলিত উন্নয়নের রঙিন চালচিত্রে এক লম্বা ফিরিস্তি। মমতা ব্যানার্জির শাসন রাজ্যে এটাই যেন দস্তুর। ধ্বংস স্তূপের ছবি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে রঙ-বেরঙের বিজ্ঞাপনে।
পশ্চিমবঙ্গ গত ১৫ বছর ধরেই সরকারি উদ্যোগে চলছে উন্নয়নের প্রচার ধামাকা। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমন কী রাস্তার হোর্ডিং— সর্বত্র উন্নয়নের ফিরিস্তি। অধুনা সেই ফিরিস্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’। নামী শিল্পীদের দিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালির সুরে সেই খতিয়ান গাওয়ানোও হয়েছে, যা রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইক বাজিয়ে জনগণকে কার্যত জোর করে শোনানো হচ্ছে। এমনকি প্রথম সারির দৈনিকগুলোতেও প্রকাশিত হয়েছে চোখ ধাঁধানো পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন। এই ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ পাঠ করলে বা শুনলে মনে হবে রাজ্যের মানুষের হাতে কাজ, পেটে ভাত আর মাথার উপর ছাদ—কোনও কিছুরই আজ আর অভাব নেই। সরকারের দাবি অনুযায়ী, রাজ্য এখন দারিদ্র ও অশিক্ষার অন্ধকার কাটিয়ে এক অভাবনীয় সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। কোটি কোটি উপভোক্তার পরিসংখ্যান আর হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের খতিয়ানে এক উজ্জ্বল ও সুখ-সমৃদ্ধ বাংলার ছবি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
যা বাস্তব তা হোল, বিজ্ঞাপনের এই ঝকঝকে পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির লম্বা তালিকা। যখন সাফল্যের দাবি কেবল সংখ্যাতত্ত্বের ফ্রেমে বন্দি হয় এবং প্রকৃত উপভোক্তার বদলে এক শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘সিন্ডিকেট’ চক্রের পকেটে জনহিতকর প্রকল্পের সুফল পৌঁছাতে থাকে, তখন সেই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কাছে এক নিষ্ঠুর প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। যেভাবে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে,তা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। একদিকে সরকারি বিজ্ঞাপনে উন্নয়নের ঢালাও প্রচার চলছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন-যন্ত্রণা প্রতিদিন বেড়ে চলা। এই বৈপরীত্যই আজকের বাংলা।
Lift Hospital
বিজ্ঞাপনে লজ্জা ঢাকে না
×
Comments :0