Brij Bhushan acquitted in sexual harassment case

ক্ষুব্ধ বীনেশ-বজরং বললেন ‘ন্যায়বিচারের লড়াই চলবে’, যৌন হেনস্তা মামলায় ব্রিজভূষণ বেকসুর খালাস!

জাতীয়

প্রমাণের অভাব, যুক্তি দেখিয়ে সোমবার দিল্লির রাউজ অ্যাভিনিউ আদালত যৌন হেনস্তার মামলায় বেকসুর খালাস করে দিল বিজেপি’র প্রাক্তন সাংসদ তথা মোদী ঘনিষ্ঠ ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে। রায় ঘোষণার পর বীনেশ ফোগট বলেন, ‘আদালতের সিদ্ধান্তে মহিলা কুস্তিগিররা অত্যন্ত হতাশ। শুরু থেকেই সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সরকার ব্রিজভূষণকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে অনেককে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবুও কয়েকজন মহিলা কুস্তিগির সমস্ত চাপ উপেক্ষা করে আদালতে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। ন্যায়বিচারের লড়াই চলবে।’ বজরং পুনিয়াও ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, শাসকদলের এই প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করাতেই দীর্ঘ আন্দোলন করতে হয়েছিল। তিনিও উল্লেখ করেন, কীভাবে একাধিক অভিযোগকারীকে ভয় দেখানো হয়। কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রশ্ন তোলেন, ‘একদিকে নারী ক্ষমতায়নের দাবি, অন্যদিকে এমন রায়ের পরে সরকারের অবস্থান সেই দাবির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?’ ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। তারপরও উত্তর প্রদেশে ভোটের আগে প্রমাণের অভাব দাবি করে তাঁকে নির্দোষ প্রতিষ্ঠিত করার এই প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল সমালোচনার মুখে পড়েছে। 
ক’দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও-বার্তায় মেয়েদের ‘সভ্য’, ‘শালীন’ আচরণের পাঠ পড়িয়েছেন। যন্তর মন্তরের আন্দোলন থেকে তাঁকে এবং তাঁর মা-কে নিয়ে কটু কথা বলা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন এবং যারা এই কাজ করেছে, তাদের তিনি ক্ষমা করে দিয়ে ‘মহান’ সাজার চেষ্টাও করেন। কিন্তু সরকারের দিকে আঙুল তুললেই যেভাবে মেয়েদের সঙ্গে বিজেপি সমর্থক, উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা অসভ্যতা করছে, ধর্ষণ করে খুনের হুমকি দিচ্ছে, তা নিয়ে তিনি কোনও সভ্যতার বার্তা দেননি। উলটে এরই মধ্যে ব্রিজভূষণকে বেকসুর খালাস করে দেওয়া হলো। একইভাবে, ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলায় বীনেশ ফোগটদেরও অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় সামাজিক মাধ্যমে আক্রমণ করা হতো। ‘দেশদ্রোহী’ বিশেষণ দেওয়া হয়েছিল তাঁদেরও। 
উত্তর প্রদেশের কাইসেরগঞ্জের সাংসদ থাকাকালীন ব্রিজভূষণ ছিলেন ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের (ডব্লিউএফআই) সভাপতিও। সেই সময়ই একাধিক মহিলা কুস্তিগিরকে যৌন হেনস্তা করেন তিনি। বীনেশ ফোগট, বজরঙ পুনিয়া, সাক্ষী মালিক, সঙ্গীতা ফোগট সহ দেশের প্রথম সারির অ্যাথলেটরা ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে পথে নামেন। এই যন্তর মন্তরেই তাঁরাও ৩৬ দিন ধরনা-অবস্থান করেন। অমিত শাহের পুলিশ একইভাবে হেনস্তা করতে থাকে তাঁদের। নির্যাতিতাদের মধ্যে নাবালিকারাও ছিল। তারাও লিখিত অভিযোগ করেছিল। প্রথমে দিল্লি পুলিশ অভিযোগ নিতেই চায়নি। পরে আন্দোলনের চাপে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু পকসোয় অভিযোগ দায়েরের পরও তাদেরই বদান্যতায় ব্রিজভূষণ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেদিন মোদী হাসিমুখে সংসদের নতুন ভবন উদ্বোধন করেন, সেদিন তাঁর আর অমিত শাহের নির্দেশে বীনেশদের রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। জাতীয় পতাকা বুকে আঁকড়ে রাস্তায় পড়েছিলেন সঙ্গীতা, সাক্ষীরা। সেই দৃশ্য দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মহলেও এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গিয়েছিল একগাল হেসে ব্রিজভূষণের সঙ্গে ছবি তুলতে। ব্রিজভূষণের সঙ্গে ফেডারেশনের প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক বিনোদ তোমরকেও খালাস করা হয়েছে। সে-ও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। 
ছ’জন মহিলা কুস্তিগির ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ করেছিলেন ২০২৩ সালে। এক নাবালিকা কুস্তিগিরকে ভয় দেখিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহার করানো হয় পরে। পদকজয়ী ক্রীড়াবিদরা যন্তর মন্তরে ধরনায় বসেন। তাঁদের দাবি ছিল, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ব্রিজভূষণের গ্রেপ্তার এবং কুস্তি ফেডারেশন থেকে তাঁর অপসারণ। কিন্তু তাঁদের কথায় স্বাভাবিকভাবেই কোনও গুরুত্ব দেয়নি মোদী সরকার। পরে তাঁরা তাঁদের পদক গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়ার ঘোষণাও করেন এবং অনশনেও বসেন। কুস্তি ফেডারেশনের নির্বাচনে ব্রিজভূষণের পছন্দের লোককেই বসানো হলে কাঁদতে কাঁদতে খেলা ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা করেন সাক্ষী। বজরঙ পুনিয়া নিজের পদক রেখে আসেন প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে। 
যন্তর মন্তরের সেই আন্দোলনের স্মৃতি আজও তাজা রয়েছে দেশবাসীর মনে। সিজেপি’র আন্দোলন ফের সেই ক্ষত মনে করিয়ে দিয়েছে। দেশের অন্যতম সফল মহিলা ক্রীড়াবিদরা যখন যৌন হেনস্থার অভিযোগে রাস্তায় নামেন, তখনও এখনকারর মতোই সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ, চরিত্র নিয়ে কুৎসা এবং ধর্ষণের হুমকি দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। বহু পরে শাহ একবার কথা বলেছিলেন অ্যাথলেটদের সঙ্গে। কিন্তু তাঁদের দাবিতে মান্যতা দেওয়া হয়নি। আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারী থেকে শুরু করে নানা অবমাননাকর বিশেষণে আক্রমণ করা হয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বড় প্রশ্ন ব্রিজভূষণ ভবিষ্যতে ভোটে লড়বেন কি না, তা নয়। বরং ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আবারও অযোধ্যা ও পূর্বাঞ্চলে বিজেপির অন্যতম নির্বাচনী সংগঠক হিসেবে তিনি সক্রিয় হবেন কি না। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নিজে টিকিট না পেলেও ছেলে করণ ভূষণ সিংকে জয়ী করিয়ে তিনি নিজের সাংগঠনিক প্রভাবের প্রমাণ দিয়েছিলেন। ফলে ভোটের আগে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করিয়ে নেওয়া বিজেপি’র জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

Comments :0

Login to leave a comment