Editorial

রুচি ও বিজেপি

সম্পাদকীয় বিভাগ

সমাজমাধ্যমে কুরুচিকর মন্তব্যকে প্রগতিশীল কোনও ব্যক্তিই সমর্থন করতে পারেন না। কিন্তু কোনটা কোন মাপকাঠিতে কুরুচিকর, কেন এই কুরুচির বাড়বাড়ন্ত, কীভাবেই বা তা রোখা যেতে পারে এই বিষয়গুলিকে তলিয়ে না ভেবে কেবলমাত্র মোড়লি করে, পুলিশি শক্তির দাপট দেখিয়ে এই কার্যকলাপকে রোখা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশের শাসকদল বিজেপি এবং তাদের সরকারকে এই সত্য বোঝাবে কে! প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্ট, স্লোগানকে আপত্তিকর দেগে দিয়ে দেশজুড়ে একের পর এক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা চলছে। কোথাও পুলিশের এফআইআর, কোথাও বিজেপি কিংবা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অভিযোগ, কোথাও আবার সাইবার অপরাধের মামলা দায়ের করা হচ্ছে। সরকার ও শাসকদলের এই তৎপরতায় প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক সমালোচনার জবাবে ক্রমশ ফৌজদারি আইনকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে? দিল্লির যন্তর মন্তরে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন কর্মসূচির সময় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে নয়ডার বাসিন্দা রুচিকা সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রথমে জিরো এফআইআর দায়ের করে উত্তর প্রদেশ পুলিশ। পরে মামলাটি তদন্তের জন্য দিল্লি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫২, ৩৫৩(১) এবং ৩৫৬(১) ধারায় মামলা হয়েছে। অভিযোগ, ওই মন্তব্য নাকি প্রধানমন্ত্রী পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মোদী সমালোচকদের বিরুদ্ধে এমন ধরনের মামলা দায়েরের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গেও ঘটেছে বলে জানা গেছে। সরকারের তরফে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ওপরেও ঘনঘন তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে মোদী সরকারের বিরোধী মন্তব্যগুলি মুছে দেওয়া, মন্তব্যকারীদের অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়ার জন্য। সব মিলিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে রুচির নিরিখে বাক্‌ স্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপ নিয়ে।
সামগ্রিকতার নিরিখে এটুকু বলাই যায় যে যন্তর মন্তর সহ সারা দেশে তরুণ প্রজন্ম যে আন্দোলন করেছে তাতে সৃজনশীল প্রতিবাদের ধারাই নতুন করে পরিস্ফূটিত হয়েছে। হিংসা কিংবা কুরুচির প্রকাশ সেখানে নিছকই ব্যতিক্রমী ও বিচ্ছিন্ন। এ সত্ত্বেও কুরুচিকর মন্তব্যের যৌক্তিকতা বিচারে বসলে সবার আগে যে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটা হলো ‘কুরুচি’র অভিযোগ কী কেবল মোদী সরকারের সমালোচকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? দেশজুড়ে বিজেপি’র শতাধিক জনপ্রতিনিধি রয়েছেন এমনকি সাংসদও রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে কুরুচিকর মন্তব্যের অভিযোগ রয়েছে। স্বয়ং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি’র মুখ্যমন্ত্রীদের মন্তব্য শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেছে বলেও অভিযোগ আছে। কখনো লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণের লক্ষ্য, কখনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। কিন্তু এই সব কোনও ক্ষেত্রেই প্রশাসনকে তৎপর হতে দেখা যায়নি। হঠাৎ যন্তর মন্তরে এবং তারপরে দেশজুড়ে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতেই শালীনতা নিয়ে সরকারের এত তৎপরতা কেন? আদৌ সমাজ সংস্কৃতি রক্ষায় তাদের আগ্রহ নাকি যেকোনো পদ্ধতিতে বিরোধিতার কণ্ঠস্বরকে দমন করাই তাদের লক্ষ্য? যদি জনশৃঙ্খলা রক্ষাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলেও মনে রাখা দরকর অশালীন ও কুরুচিকর মন্তব্য যখন কোনও দায়িত্বশীল পদাধিকারীর কণ্ঠে শোনা যায় তখন সেটাই জনশৃঙ্খলার পক্ষে অনেক বেশি বিপজ্জনক। সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠে উচ্চারিত অপশব্দের সেই ক্ষমতা নেই, সেগুলি নিছকই নিন্দনীয়। 
বিজেপি’র উত্থাপিত অভিযোগ ও পুলিশি তৎপতার পিছনের উদ্দেশ্য নিয়ে আরও সন্দেহ দেখা দেয় যখন কুরুচিকর ও অশালীন মন্তব্যের জন্য দেদার ফৌজদারি ধারার অপপ্রয়োগ দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী বা কোনো পদাধিকারীর মানহানি ঘটে থাকলে তার জন্য নির্বিচারে ফৌজদারি ধারা প্রয়োগ করা যায় না, দেওয়ানি বিধিতে বিচার বিভাগের হাতেই তার বিবেচনা হওয়া উচিত। শাস্তিযোগ্য অপরাধ কেউ করে থাকলে তার সাজা হওয়াটাই উচিত, কিন্তু অন্যথায় মোদী শাহ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে দমন করতে দেশজুড়ে ব্যাপকহারে ধরপাকড় হলে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের পুলিশি হয়রানিই জুটবে। এতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ হতে পারে, ন্যায়বিচার হবে না।

Comments :0

Login to leave a comment