Dhupguri Potatoes Farmer

দাম না পেয়ে গ্রামবাসীদের বিনামূল্যে আলু ধূপগুড়ির কৃষকের

জেলা

বাজারে আলু কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, অথচ সেই আলুর ন্যায্য দাম না পেয়ে এবার সর্বস্বান্ত হয়ে গ্রামবাসীদের বিনামূল্যে আলু বিলিয়ে দিতে বাধ্য হলেন এক প্রান্তিক কৃষক। বানারহাট ব্লকের এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো, তৎকালীন ও বর্তমান উভয় সরকারের জমানায় ফসলের প্রকৃত কারিগর কৃষকের কপালে শুধুই জুটছে চোখের জল আর ঋণের বোঝা। লোকসানের বাজারে ব্যবসায়ীদের জলের দরে আলু দেওয়ার চেয়ে গ্রামের গরিব মানুষ দু-মুঠো ফুটিয়ে খাক— এই চরম হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই নিজের কষ্টার্জিত ফসল বিলিয়ে দিলেন বানারহাট ব্লকের নাথুয়া ফটকটারি এলাকার আলু চাষী রঞ্জিত রায়।
তিনি জানান, চলতি মরশুমে তিনি বিপুল খরচ করে বেশ কয়েক বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। একদিকে প্রতিকূল আবহাওয়া, অন্যদিকে জমিতে জল জমে যাওয়ায় এমনিতেই ফলন এবার ধাক্কা খেয়েছিল। বিঘাপ্রতি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হাড়ভাঙা খাটুনি ও খরচের পর, আলু তোলা এবং তা হিমঘরে কিংবা নিজের টিনের শেডে মজুত রাখার জন্য আরও বাড়তি কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে তাঁকে। আশা ছিল বাজারে সঠিক দাম মিলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।
আলু চাষিদের অভিযোগ, খুচরো বাজারে যখন আলুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন পাইকারি বাজারে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে কেজি প্রতি মাত্র ২ টাকা! বর্তমানে ব্যবসায়ীরা মাত্র ২০০ থেকে ২২০ টাকা কুইন্টাল হিসেবে আলু কিনতে চাইছে, যা উৎপাদন খরচের ভগ্নাংশ মাত্র। এমনকি এই নামমাত্র দামেও আলু কেনার মতো ব্যবসায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। রৌদ্র আর বৃষ্টির কারণে দীর্ঘদিন ধরে শেডে মজুত রাখা আলু পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই চরম অসম ও শোষণমূলক বাজারে আলুর কোনো সঠিক মূল্য না পেয়ে শেষমেশ চরম হতাশায় ভেঙে পড়েন রঞ্জিতবাবু। লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়েই তিনি নিজের শেডে মজুত রাখা প্রায় ৪০০ প্যাকেট আলু স্থানীয় গ্রামবাসীদের বিনামূল্যে বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শনিবার থেকেই বানারহাট ব্লকের ওই এলাকায় দেখা যায় এক অভূতপূর্ব ও করুণ দৃশ্য। রঞ্জিতবাবুর ঘর থেকে আলু নেওয়ার জন্য গ্রামবাসীরা যে যার মতো টোটো, ভ্যান, সাইকেলে করে, এমনকি অনেকে হেঁটেই চলে আসেন। কৃষকের এই দুর্দশা দেখে গ্রামবাসীদের চোখেও ছিল জল। অথচ সাধারণ মানুষ জানালেন, খোলা বাজারে তাঁদের ৭ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের সময় লোকসানের ক্ষতিপূরণ চেয়ে কৃষকেরা আবেদন করলেও ভোটের রাজনীতির চক্করে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ফাইল চাপা পড়ে গেছে সরকারি দপ্তরে। আর বর্তমান কর্পোরেট-তোষণকারী সরকারের আমলেও কৃষকদের এই দুর্দশা ঘোচানোর কোনো সদিচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মহাজনী ঋণ আর হিমঘরের ভাড়ার দায়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে সরকারকে কৃষকদের এই দুর্দশার দিকে নজর দিতে হবে। হিমঘরে পড়ে থাকা আলু যাতে দ্রুত রাজ্যের বাইরে রপ্তানি করার ব্যবস্থা করা হয়, তার জন্য সরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানি চালু হলে কৃষকরা অন্তত তাঁদের আসল খরচের টাকা টুকু ফিরে পাবেন।
সারা ভারত কৃষক সভার জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক প্রাণ গোপাল ভাওয়াল বলেন, "আমরা প্রত্যেকেই জানি জেলার আলু চাষী আলুর দাম না পেয়ে ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যাপক পরিমাণ আলু উৎপাদন করেও ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে আজ তাঁরা অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক যে, হিমঘরে আলু রাখতে না পেরে এখনও কৃষকের বাড়িতে খোলা আকাশের নিচে বিপুল পরিমাণ আলু পড়ে রয়েছে।" তিনি সরকারের প্রতি তীব্র দাবি জানিয়ে আরও বলেন, "অবিলম্বে সরকারকে উপযুক্ত দাম দিয়ে সরাসরি চাষীদের কাছ থেকে আলু ক্রয় করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত আলু চাষীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে।" একই সাথে তিনি পাট ও ভুট্টা চাষীদের অনুরূপ দুর্দশার কথা তুলে ধরে তাঁদেরও দ্রুত সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কর্পোরেট-তোষণকারী এই সরকার কি আদৌ শুনবে মেহনতি চাষীর এই আকুল আর্জি? উত্তর খুঁজছে উত্তরবঙ্গ।

Comments :0

Login to leave a comment