Editorial

গাজার কণ্ঠস্বরে নারাজ মোদী

সম্পাদকীয় বিভাগ

ইরানে মার্কিন হামলার নিন্দায় বিবৃতি দিতে পারেনি ভারত সরকার। এমনকি গাজায় বছরের পর বছর ধরে ইজরায়েলের গণহত্যা চালানোরও নিন্দা করতে পারেনি স্বঘোষিত বিশ্বগুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আরও উদ্বেগজনক হলো, ভারতবাসী যাতে এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হতে পারে তার জন্য মোদী সরকারের তৎপরতা। গাজায় ইজরায়েলের হামলার ঘটনা নিয়ে তৈরি একটি সিনেমা ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’-এর ভারতের বাজারে মুক্তি আটকে দিয়েছে মোদী-শাহ নিয়ন্ত্রিত সেন্সর বোর্ড। ছবিটি ব্লক করে দেওয়া হয়েছে ভারতে। ইজরায়েলের হামলায় পাঁচ বছরের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তৈরি তিউনিশিয়ার এই সিনেমাটি সারা বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছে এমনকি অস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঠাঁই পেয়েছে। কাউথার বেন হানিয়া পরিচালিত এই ছবিটি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজায় বোমা হামলা থেকে বাঁচতে পালাতে গিয়ে পাঁচ বছরের শিশু রাজাব ও তার পরিবারের মৃত্যুর ঘটনাকে তুলে ধরে তৈরি হয়েছে। রাজাবের আতঙ্কিত অবস্থায় জরুরি পরিষেবায় ফোন করেছিল, আসল সেই অডিও ব্যবহার করা হয়েছে ছবিতে। মুম্বাইয়ের জয় ভীরাত্রা এন্টারটেইনমেন্টের নামের একটি সংস্থা ভারতে এই সিনেমাটি মুক্তির দায়িত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সংস্থার পক্ষে মনোজ নন্দোয়ানা সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করে দিয়ে তাঁকে বলা হয়েছে যদি এই ছবি এদেশে মুক্তি পায়, তাহলে ভারত-ইজরায়েলের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। গত ফেব্রুয়ারিতে ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন’ (সিবিএফসি)-র কাছে ফিল্মটি জমা দিয়েছিলেন তিনি। অস্কার ঘোষণার আগে মার্চের মাঝামাঝি যদি ছবিটি দেশে দেখানো যায়, সেই পরিকল্পনাই থাকলেও শেষপর্যন্ত ছবিটি মুক্তির অনুমোদন মেলেনি। গাজার কণ্ঠস্বরে আপত্তি দেখালেন মোদী। 
যে সিনেমা আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে, সেই সিনেমাও ভারতের দর্শকদের দেখাতে এত আপত্তি কেন মোদী সরকারের সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। এর আগে বিবিসি’র মতো মর্যাদাসম্পন্ন সংস্থার নির্মিত গুজরাট গণহত্যার ওপরে তথ্যচিত্র ‘মোদী কোয়েশ্চনস’ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল এই বিজেপি সরকারই। ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন’কে সরকার কার্যত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে, কখনো সিনেমার নাম পরিবর্তনে বাধ্য করছে, কখনো পুরো সিনেমাই নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াও সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে নানারকম বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদীদের হামলা চালিয়ে। সিনেমা পছন্দ না হলে কোথাও শ্যুটিং ফ্লোরে হামলা হয়েছে, কোথাও গেরুয়া বাহিনী হামলা করেছে সিনেমা হলে। এসবই ভারতের সংবিধান প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপ। নাগরিকরা কী বলবেন, কী দেখবেন, কী শুনবেন তা নিয়ে অধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রই জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, এগুলি গণতন্ত্রের ওপরে আক্রমণ। কিন্তু এবারে গাজা নিয়ে একটি সিনেমাকে নিষিদ্ধ করে মোদী সরকার তার আরও একটি রাজনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে দিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তির পর ভারতের সার্বভৌমত্ব ঘোষিত হয়েছিল। সেই সার্বভৌমত্ব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা তাদের দোসর ইজরায়েলের কাছে বিকিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। ভারতের স্বাধীন বিদেশনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য ভারতকে এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল, আন্তর্জাতিক দরবারে ভারতের মর্যাদা তৈরি করেছিল। কোনও সামরিক ও সাম্রাজ্যবাদী জোটের পক্ষে না থাকায় রাষ্ট্রসঙ্ঘেও ভারতের কণ্ঠস্বর এই উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিল। কিন্তু মোদী সরকার ক্রমশ সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন বিদেশনীতি ছেড়ে পরোক্ষে আমেরিকা ও ইজরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় নেমেছে। এতে বিশ্বের দরবারের ভারতের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, ভারত ক্রমশ বন্ধু হারাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যতের জন্য এটা মোটেই ভালো লক্ষ্মণ নয়।

 

Comments :0

Login to leave a comment