সুব্রত দাশগুপ্ত
বাংলা কাব্য-সাহিত্য-সংগীত জগতে যে ক্ষণজন্মা স্রষ্টারা আমাদের চেতনাকে আলোড়িত করেছেন, আমাদের হৃদয় ও মননে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন তাঁদের অন্যতম একজন যদি হন রবীন্দ্রনাথ তাহলে আরেকজন কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালি আজও একই নিঃশ্বাসে 'রবীন্দ্র-নজরুল' শব্দবন্ধ উচ্চারণ করে। রবীন্দ্রনাথের পর যাঁর কবিতার মৌলিকত্ব আমাদের বহুকাল ধরে আবিষ্ট করে রেখেছে তিনি নজরুল। আধুনিক বাংলা কবিতার সূত্রপাত হয়েছিল তাঁর হাত ধরে- একথা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হয় না। আবার তিনিই বাংলা কবিতার মধ্যে আরবী, পার্সি, উর্দু শব্দের ব্যবহার করে কবিতাকে এক ভিন্নতর উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন ।
কিন্তু কেবলমাত্র সাংস্কৃতিক বা সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, নজরুলকে আমরা পাই একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও। পরাধীনতার বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতিবাদ আন্দোলন যখন ক্রমাগত ব্যাপ্ত হচ্ছে, পাশাপাশি পরাজয়ের আশংকায় শঙ্কিত ইংরেজ শক্তি যখন অত্যাচারের শেষ সীমা অতিক্রম করছে সেই সময়ে, ১৯২০ সালে বাংলা সাহিত্য সমাজে নজরুলের আত্মপ্রকাশ। তিনি নিজেকে এই চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার অভিঘাত থেকে সরিয়ে রাখতে চাননি। তাই তাঁর অগ্নিবর্ষী কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে 'বিদ্রোহী', 'আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে', 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার', 'ছাত্রদলের গান', 'ফরিয়াদ', 'সব্যসাচী'র মতো কবিতাগুলি ।
তাঁর কবিতার মতোই বৈচিত্র্যপূর্ণ নজরুলের জীবন। কাজী পরিবারের সন্তান তিনি। কিন্তু পিতা কাজী ফকির আহমেদ নিঃস্ব অবস্থায় প্রয়াত হওয়ায় বাল্যাবস্থায় যে নিদারুণ অসহায়তার মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছিল, তার মোকাবিলা করে ক্ষুণ্ণিবৃত্তির প্রয়োজনে তিনি লেটোর দলে গান বাঁধা থেকে রুটির দোকানে কাজ করা পর্যন্ত নানাবিধ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। পৃথিবীর পাঠশালায় এইভাবে পাঠ নিতে নিতে সঞ্চিত যে অভিজ্ঞতা সেটাই তাঁকে ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। হয়তো সেই কারণেই যে ছাত্রটি গ্রামের মকতব থেকে বিদ্যালয়ের পাঠ শুরু করে, দু’টি বিদ্যালয় ঘুরে শেষ পর্যন্ত শিয়ারশোল রাজ হাই স্কুলের মতো একটি প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে, সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় ডবল প্রমোশন পেয়ে সরাসরি নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়, যে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় স্কলারশিপ পাবেই বলে সহপাঠীরা নিশ্চিত থাকে, সেই ছাত্রটি কিনা ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়ে, দেশীয় সৈন্যদলে যোগ দিতে স্কুল ছেড়ে চলে যায়!
নজরুলের এই সৈন্যদলে যোগদানের কারণ নিয়ে, তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু-পরামর্শদাতা-পথপ্রদর্শক এবং সবচেয়ে তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ নজরুল-জীবনীকার কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ (কাকাবাবু) লিখেছেন— " ১৯১৭ সালে ভারতের ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট একটি বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি গঠন করতে রাজি হলেন। তখন সেই সময়ের দেশ নেতারা সৈন্যদলে ভর্তি হওয়ার জন্য বাঙালী যুবকদের আহবান জানালেন। অন্য অনেক যুবকের মতো শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণির প্রথম ছাত্র কাজী নজরুল ইসলামও এই আহ্বানে সাড়া দিল। বেঙ্গলি ডবল কোম্পানিতে, পরে বেঙ্গলি রেজিমেন্টে, যে বাঙালী যুবকেরা যোগ দিয়েছিল তাঁদের সকলের মনে কি ছিল তা জানিনে, তবু বহুসংখ্যক লোক ভেবেছিলেন যে এটা একটা দেশপ্রেমের কাজ। নজরুল ইসলামও এই বহুসংখ্যকের একজন ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন যে যুদ্ধে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চয় আছে, কিন্তু বাঁচলে তাঁরা যুদ্ধবিদ্যা ও নূতন নূতন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার (অবশ্য আর্টিলারির ব্যবহার ভারতীয়দের শেখানো হতো না) আয়ত্ত করেই বাঁচবেন। দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে এর প্রয়োজনের কথা কে অস্বীকার করতে পারে?" যৌবনে পদার্পণ করেই যাঁর দেশপ্রেমিক হৃদয় এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাঁকে কেবলমাত্র কবি-সাহিত্যিক-সংগীত রচয়িতার পরিচয়ে বেঁধে রাখার প্রয়াস নিশ্চিতভাবেই অভিসন্ধিমূলক। তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাঁর সমাজভাবনা, আদর্শবোধ, রাজনৈতিক অবস্থান। আর সে'কারণেই, সমাজসচেতনতা আর রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণের মূল্য চোকাতে গিয়ে তাঁকে ব্রিটিশ রাজশক্তির কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছে, থাকতে হয়েছে ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারিতে।
১৯২০ সালের প্রথম দিকেই 'ঊনপঞ্চাশ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট' ভেঙে দেওয়া হলে নজরুল পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে এসে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিসে বসবাস শুরু করেন। অবশ্য ওই বছরই জানুয়ারি মাসে সাত দিনের ছুটিতে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন এবং তখনি মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। কাকাবাবুর বর্ণনা— "হ্যাঁ, কাজী নজরুল ইসলামকে সেদিন আমি প্রথম দেখলাম। সে তখন একুশ বছরের যৌবনদীপ্ত যুবক। সুগঠিত তার দেহ আর অপরিমেয় তার স্বাস্থ্য। কথায় কথায় তার প্রাণখোলা হাসি। তাকে দেখলে, তার সঙ্গে কথা বললে যে কোনও লোক তার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারত না।" সমিতির অফিসে বসবাসের সময় থেকেই, সেই সময়ে প্রসিদ্ধি লাভ করা প্রথম শ্রেণির বাংলা মাসিক পত্রিকা 'মোসলেম ভারত'-এ নজরুলের লেখা প্রকাশ হতে শুরু করে। যদিও, সৈন্যদলে থাকার সময়ে, ১৯১৯ সালে, রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষিতে লেখা 'ব্যথার দান' গল্পেই নজরুলের সাহিত্য প্রতিভা উন্মোচিত হয়। পরবর্তীতে 'মোসলেম ভারত'-এ সেটিও প্রকাশিত হয়। একথা ঠিক যে 'মোসলেম ভারত' এবং 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র মাধ্যমেই এদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে নজরুল ইসলামের পরিচিতি ঘটেছিল, কিন্তু তিনি কেবলমাত্র সমাজের এই বুদ্ধিজীবী অংশের জন্য কলমকে ব্যবহার করেননি। বরং তাঁর লেখা আকৃষ্ট করত সমাজের একেবারে তলার দিকে থাকা, জীবননির্বাহে ক্লান্ত ন্যূব্জ মানুষকেও। কাকাবাবু লিখেছেন—"নজরুল শুধু শিক্ষিত-সমাজে কাব্যচর্চা করত না। তার পরিচয়ের পরিধিও সুবিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। আমি দেখেছি, তার গান ও কবিতার আবৃত্তি শোনার জন্য চটকলের বাঙালী মজুরেরা পর্যন্ত তাকে ডেকেছে। পরে সে কৃষকদের ভিতরেও ঘুরেছে। —সে পৌঁছেছে জনগণের মধ্যেও। এই জন্যই বাংলা দেশের কবিদের ভিতরে নজরুল ইসলাম সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় হতে পেরেছিল। আজও কারখানার মজুরেরা পর্যন্ত তাঁর জন্মদিন পালন করে।" এখানেই একজন গণশিল্পীর সৃষ্টির সার্থকতা। সেই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— "যে আছে মাটির কাছাকাছি,/ সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি"; নজরুল ছিলেন সেই 'মাটির কাছাকাছি' কবি ।
কাজী নজরুল সেইসব সৃষ্টিশীল মানুষের অন্যতম যাঁরা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতাবাদী স্বার্থান্বেষীদের কুৎসিত আক্রমণের শিকার হয়েছেন। আর হবেন নাই বা কেন! তাঁর কলম যে কোনও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি বা কু-আচারকেই রেয়াত করেনি। নজরুলের জন্মের প্রায় একশো বছর আগে এই বাংলার এক যুগন্ধর বাউল ফকির লালন শাহ্ জাতপাতের অসারতা নিয়ে গান বেঁধেছিলেন - "ছোন্নত করলে হয় মুছলমান / নারী লোকের কি হয় বিধান / বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ / বামনী চিনি কিসে রে / সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে!" নজরুল তাঁর 'দে গরুর গা ধুইয়ে' কোরাস গানে জাতপাতের সংকীর্ণতাকে বিঁধে, পদ বাঁধলেন - "মাজায় বেঁধে পৈতে বামুন রান্না করে কার না বাড়ী / গা ছুঁলে তার লোম ফেলেনা ঘর চুলে তাঁর ফেলে হাঁড়ি" । আবার আত্মপরিচয়জ্ঞাপক কবিতা 'আমার কৈফিয়ৎ'-এ মোল্লাতন্ত্রকে উপহাস করে লিখলেন— "মৌ-লোভী যত মৌলবী আর 'মোল-লারা' ক'ন হাত নেড়ে / দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে"। এখানে যতিচিহ্নসমূহের ব্যবহারও লক্ষ্য করার মতো। আবার 'সর্বহারা' কাব্যগ্রন্থের 'ঈশ্বর-মানুষ-পাপ-বারাঙ্গনা-নারী-কুলি মজুর' এই ছয়টি ভাগে রচিত দীর্ঘ কবিতা 'সাম্যবাদী'তে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন চিরায়ত সত্যকে— " মিথ্যা শুনিনি ভাই / এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনও মন্দির-কাবা নাই"। আমাদের স্মরণে আসে মধ্যযুগের আরেক বাঙালি কবি বড়ু চণ্ডীদাসের কালোত্তীর্ণ উচ্চারণ— "শুনহ মানুষ ভাই / সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"। চণ্ডীদাস থেকে নজরুল— এই জীবনবোধ, এই সংস্কৃতি আমাদের পরম সম্পদ। উন্নত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যা উন্নত সমাজ গড়ার পূর্বশর্ত, গড়ে তুলতে হলে এসব চর্চার কোনও বিকল্প নেই। "হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন"- মধুকবির সৃষ্ট এই সত্যবাক্য পুনরুচ্চারণের মধ্যে কোনও বাঙালি-অস্মিতা নেই, আছে অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে স্পর্শ করার সাহস। রত্ন ভাণ্ডারের উত্তরাধিকারকে বহন করতে না পারলে সমাজের বিপথগামীতাকে ঠেকানো যায় না।
কাজী নজরুল ইসলামের মতো ক্ষণজন্মা প্রতিভাধর মানুষটির সৃষ্টিশীলতার সময়কাল মাত্র তেইশটি বছর, ১৯১৯ থেকে ১৯৪২সাল। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি লিখেছেন চার হাজারেরও বেশি গান, আঠারোটি গল্প, তিনটি উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং অসংখ্য কবিতা। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে দুরারোগ্য স্মৃতিভ্রংশ রোগে (Pre-senile Dimentia) আক্রান্ত হয়ে যেভাবে তাঁর চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে গেল, যেভাবে বিনা মেঘে আকস্মিক বজ্রপাতে অগ্নিবীণার তার ছিঁড়ে গেল তাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো উভয় বাংলার সংস্কৃতি জগৎ, যে ক্ষতি বাস্তব অর্থেই অপূরণীয়। উন্নত সমাজ গঠনের সংগ্রামে প্রগতিশীল সংস্কৃতির বহমান ধারাকে পুষ্ট করার প্রয়াসে নজরুলের অবদান যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে দুই বাংলার মানুষ।
বর্তমান রাষ্ট্রশক্তির প্ররোচনা ও মদতে তৈরি হওয়া ভ্রাতৃবিদ্বেষকলুষিত এই পরিমণ্ডলকে পালটাবার জন্যই হোক বা পশ্চিমবাংলায় বামপন্থী শক্তির পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনে 'বাম বাস্তুতন্ত্র' (Left ecosystem) গড়ে তোলার জন্যই হোক, নজরুল ইসলামের অনন্যসাধারণ সৃষ্টির চর্চা আজ একান্ত প্রয়োজন। বামপন্থী এবং প্রগতিশীল চিন্তার মানুষজন ছাড়া এই দায়িত্ব আর কেই বা নেবে!
Comments :0