Anti social or voice of dissent

গুন্ডা দমন না‍‌ গণদমন

সম্পাদকীয় বিভাগ

শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্যের আরএসএস-বিজেপি সরকার দু’মাস কাটাতে না কাটাতেই বিধানসভায় বিল পাশ করিয়ে এবং রাজ্যপালকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টিসোসাল অ্যাক্টটিভিটিজ অ্যাক্ট ২০২৬ এককথায় গুন্ডা দমন আইন চালু করেছে। সমাজবিরোধী ও দুষ্কৃতীমূলক কার্যকলাপ প্রতিহত করে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনও দেশেই আইন থাকে। পুলিশ সেই আইনের ধারা-উপধারা প্রয়োগ করে অপরাধীদের সাজা দেবার ব্যবস্থা করে। স্বাধীন ভারতেও বরাবর আইন ছিল এবং আছে। সুদীর্ঘকাল চালু ছিল ভারতীয় দণ্ডবিধি। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদীদের মনে হয়েছে দেশ শাসনে এই আইন যথেষ্ট কড়া নয়। তাই দণ্ডবিধি বদল করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা চালু করে। নতুন আইন আগের থেকে অনেক বেশি কঠোর। অর্থাৎ সরকার তথা পুলিশের হাতে ক্ষমতা অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। অপরাধের সঙ্ঘা অদলবদল করে অপেক্ষাকৃত কম অপরাধকেও বড় করে দেখিয়ে বড় সড় সাজার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই বিপরীতে নাগরিকদের স্বাধীনতা ও অধিকার খর্বিত হয়েছে।
অতীতের থেকে অনেক কঠোর ন্যায় সংহিতা চালুর পরও শুভেন্দু অধিকারীর মনে হয়েছে এরাজ্যে সমাজবিরোধী-দুষ্কৃতীদের দাপট এতটাই বেশি যে ন্যায় সংহিতা দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাই তারা আরও কঠোর গুন্ডা দমন আইন এনেছেন। রাজ্য বিজেপি-র সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী খোদ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মী-সহযোগীরা যদি গুন্ডা হয়ে থাকে তাহলে নেতাজীর উত্তরাধিকার হিসেবে এরাজ্যে গুন্ডাদের আধিক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। সম্ভবত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তথা রাজনৈতিক হিন্দুত্বের বিরুদ্ধ স্বর এরাজ্যের রাজনৈতিক ঘরানায় প্রবল থাকার কারণে হিন্দুত্ববাদীরা এরাজ্যে গুন্ডাদের ব্যাপক প্রভাব অনুভব করছে। হিন্দুত্ববাদের চোখে যারা গুন্ডা সেইসব ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনকারীদের দমন করতে, প্রতিবাদী কণ্ঠ রুদ্ধ করতে, ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা বন্ধ করতে ন্যায় সংহিতা নয়। তাই এই রাজ্যে গুন্ডা দমন আইন আনতে হয়েছে। কারণ ন্যায় সংহিতা শাসকের হাতে যতটা ক্ষমতা দিয়েছে গুন্ডাদমন আইন দিয়েছে তার থেকে অনেক বেশি। এই আইন বিচার বিভাগের এক্তিয়ার খর্ব করে শাসন বিভাগের হাতে বিপুল ক্ষমতা দিয়েছে অভিযোগ প্রমাণের আগেই নিছক সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে সাজা দেবার অথবা তার যাবতীয় নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে ন্যূনতম এক বছর বিনা বিচারে বিনা তদন্তে জেলে বন্দি করার।
শাসক দল বা সরকার যদি কাউকে গোলমালের জন্য সন্দেহ করে বা গোলমাল করতে পারে বলে মনে হয় সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার করে এক বছর জেলে পুরে রাখতে পারে। এক্ষেত্রে আদালতের কোনও ভূমিকা থাকবে না। মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীরা রীতিমতো হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সিপিআই(এম)’র ‘হার্মাদ’ এবং তৃণমূলের গুন্ডাদের জব্দ করতে এই আইন দরকার ছিল। মন্ত্রীদের ভাষ্যই পরিষ্কার করে দিচ্ছে এই আইনের আসল টার্গেট বিরোধীরা। বড় ব্যবধানে জিতে ক্ষমতায় এলেও বিজেপি-র ক্ষমতায় টিকে থাকা নিয়ে দুর্ভাবনা আছে। সেক্ষেত্রে বিরোধীদের ভয় পাচ্ছে। সরকারবি‍‌রোধী আন্দোলন, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ যদি কড়া হাতে দমন করা না যায়, সরকারের সমালোচনা, বিরোধিতা যদি বন্ধ করা না যায় তাহলে শুভেন্দুরা মনে করছেন জনমত বিরুদ্ধে চলে যাবে। হিন্দুত্বের আফিম খাইয়ে মানুষকে বেশিদিন বুঁদ করে রাখা যাবে না। তাই প্রতিবাদ, বিরোধিতার গণতান্ত্রিক অধিকার ও পরিসরটাই কেড়ে নিতে চায় সরকার। এটা মানুষের কণ্ঠরোধ, গণআন্দোলন বন্ধ করার স্বৈরতান্ত্রিক পথ। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বিজেপি তাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। গণতন্ত্রে অপরিহার্য বিরুদ্ধ স্বরকে বন্ধ করে এরা একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

Comments :0

Login to leave a comment