World Cup Football

দক্ষিণের পায়ের শব্দ

সম্পাদকীয় বিভাগ

শমীক লাহিড়ী

এই বিশ্বকাপ আমাদের কী দিল?
একটি ট্রফির দিকে এগিয়ে যাওয়া ৪৮ দলের গল্প ?
কয়েকটা গোল ?
কয়েকজন নতুন নায়ক ?
না। এই বিশ্বকাপ আমাদের একটি আয়না দিল।
সেই আয়নায় পৃথিবী নিজেকে দেখল। দেখল, ভূ-অর্থনীতির মানচিত্র আর ফুটবলের মানচিত্র এক নয়।
দেখল, সীমান্ত, অভিবাসন, পাসপোর্ট, কর্পোরেট, ঋণ, ইতিহাস এবং স্মৃতি— সবকিছুই কোনও না কোনোভাবে একটা বলের ভেতরে বাস করে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এই বিশ্বকাপ আমাদের মনে করিয়ে দিল যে পৃথিবীর দক্ষিণ এখনও বেঁচে আছে। এবং এখন আগের চাইতে অনেক বেশি জোরে দৌড়াতে পারে।
অনেক বছর ধরে বিশ্বকাপ ছিল ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার সম্পত্তি। বাকিরা ছিল অতিথি। আফ্রিকার কাজ ছিল সাহসীভাবে হারার। এশিয়ার কাজ ছিল অভিজ্ঞতা অর্জন করা। ছোট দেশগুলোর কাজ ছিল বড়দের জন্য গোলের সংখ্যা বাড়ানো। এদের জন্য আগে থেকেই একটি সংলাপ লেখা থাকতো — ‘তারা খুব ভালো লড়াই করেছে।’ ফুটবলের অভিধানে এই বাক্যের অর্থ — তারা হেরেছে।
এই বিশ্বকাপ সেই অভিধানের কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে ফেলেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৮ দলের টুর্নামেন্টে আফ্রিকার ৯টি দল সরাসরি প্রথমবার স্থান পেয়েছে। অনেকেই বলেছিলেন, এতে বিশ্বকাপের মান কমবে। কিন্তু এর উত্তর এসেছে মাঠে।
মরক্কো নেদারল্যান্ডসকে বিদায় জানিয়েছে।
প্যারাগুয়ে জার্মানিকে থামিয়েছে।
ডিআর কঙ্গো নকআউট পর্বে নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করেছে।
আলজেরিয়া, মিশর, ঘানা, সেনেগাল, কেপ ভার্দে— তারা আর বিশ্বকাপের পর্যটক নয়।
তারা শুধু গল্পের চরিত্র নয়। তারা গল্পের লেখক হতে এসেছে।

একসময় ছোট দেশগুলো পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে খেলতে নামলে ক্যামেরা তাদের চোখে ভয় খুঁজত। এবার ক্যামেরা ভয় খুঁজেছে অন্য পাশে। কারণ ফুটবল মাঝে মাঝে ইতিহাসের চেয়েও ন্যায়পরায়ণ। ইতিহাসে উপনিবেশবাদীরা প্রায়ই জিতেছে। ফুটবলে কখনও কখনও উপনিবেশিতরাও জেতে।

আফ্রিকার উত্থান কেবল ফুটবলের উত্থান নয়। এ ইতিহাসেরও প্রতিশোধ। একসময় আফ্রিকা থেকে লুট হয়েছিল সোনা। বেরিয়ে গিয়েছিল হীরা। বেরিয়ে গিয়েছিল রাবার, কোবাল্ট, ইউরেনিয়াম। আর দাস হিসাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মানুষ। আজ তাঁদেরই সন্তানরা ইউরোপের স্টেডিয়ামে ফিরে এসেছে ফুটবলার হয়ে। তারা ইতিহাসের বইয়ে ফেরেনি। তারা ফিরেছে স্কোরবোর্ডে। যে মহাদেশের সম্পদ দিয়ে ইউরোপ শিল্পবিপ্লব গড়েছিল, সেই মহাদেশের সন্তানরাই আজ ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

ইতিহাসের একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে। সে মাঝে মাঝে সুদ সহ ঋণ ফেরত দেয়।
ফ্রান্সের জার্সিতে আফ্রিকার হৃদস্পন্দন শোনা যায়। ইংল্যান্ডের জার্সিতে ক্যারিবীয় সাগরের ঢেউ আছে। নেদারল্যান্ডসের জার্সিতে সুরিনামের নদী আছে। বেলজিয়ামের জার্সিতে কঙ্গোর দীর্ঘ ছায়া আছে। পর্তুগালের জার্সিতে আফ্রিকার পুরানো উপনিবেশগুলোর স্মৃতি রয়েছে।
ইউরোপের স্টেডিয়ামে যে গোলগুলো উদ্‌যাপিত হয়, তার অনেকগুলোর শিকড় হয়তো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের কোনও মরুভূমিতে, কোনও বন্দর শহরে, কোনও উদ্বাস্তু শিবিরে বা কোনও অভিবাসী পাড়ায়।
ফুটবল কখনও কখনও ইতিহাসের সবচেয়ে সৎ আর্কাইভ। সে ভুলে যায় না। সে শুধু অপেক্ষা করে।
একসময় ইউরোপ আফ্রিকার দিকে লুট করার জন্য জাহাজ পাঠাতো। আজ আফ্রিকার সন্তানরা ইউরোপের হয়ে বিশ্বকাপে গোল করছে। যে মহাদেশের সোনা দিয়ে ব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছিল, সেই মহাদেশের সন্তানদের পা দিয়ে এখন ট্রফির স্বপ্ন তৈরি হচ্ছে।
কেউ একে বিশ্বায়ন বলে। কেউ অভিবাসন বলে। কেউ শ্রমবাজার বলে।
ইতিহাসের অভিধানে এর আরেকটা নামও আছে — ‘ফিরে আসা’।
কিন্তু এই বিশ্বকাপ শুধু বিদ্রোহের গল্প নয়। এ ডলারেরও গল্প। একসময় ফুটবল ছিল গরিব মানুষের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। কাপড়ের বল। দু’টো ইট। একটু খালি জায়গা। ব্যস। খেলা শুরু। বল ছিল সস্তা। তবে স্বপ্নগুলো ছিল দামি।
আজ সেই খেলার চারপাশে নির্মিত হয়েছে বিলিয়ন ডলারের প্রাচীর। ফিফার চার বছরের বাণিজ্যিক আয়ের পরিমাণ এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকার, স্পনসরশিপ, স্ট্রিমিং, ডিজিটাল কনটেন্ট, লাইসেন্সিং– সব মিলিয়ে ফুটবল এখন পৃথিবীর বৃহত্তম বিনোদন শিল্পগুলোর একটি। একটা গোল এখন শুধু গোল নয়। সেটাও বিজ্ঞাপন। একটা ব্র্যান্ড। বাজারমূল্যে মাপা হয় তাকে। শেয়ারহোল্ডারের হাসি। বেটিং ক্লাবে মদিরার ফোয়ারা।

একসময় ক্লাব ছিল শ্রমিকদের সম্প্রদায়। আজ অনেক ক্লাব বিনিয়োগ তহবিলের সম্পদ। একসময় সমর্থকরা দল তৈরি করত। আজ অনেক সময় দলগুলো সমর্থক তৈরি করে। একসময় স্টেডিয়াম ছিল শহরের আত্মা। আজ তা কর্পোরেট আতিথেয়তার বাজার। একসময় জার্সির বুকের উপর থাকত ক্লাবের আবেগ-ভালোবাসা-স্বপ্ন দেখার প্রতীক। আজ সেখানে থাকে কোনও কোম্পানির নাম।

একসময় ফুটবলাররা শহরের নায়ক ছিল। আজ তারা বহুজাতিক ব্র্যান্ডের দূত। ফুটবল এখনও গরিবের স্বপ্ন। কিন্তু তার মালিকানা ধীরে ধীরে ধনীদের হাতে চলে যাচ্ছে। যে খেলার জন্ম হয়েছিল বন্দর নগরীতে, খনি অঞ্চলে, কারখানার ছুটির বিকেলে, সেই খেলাই আজ বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কর্পোরেট পরামর্শ সংস্থার ভাষায় কথা বলতে শিখছে। গ্যালারির মানুষ কিন্তু এখনও গান গায়। কিন্তু খেলার হিসাব অনেক আগেই স্প্রেডশিটে চলে গেছে। একসময় স্কাউটরা খেলোয়াড়ের চোখ দেখত। আজ তারা তার ডেটা এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে।
একসময় কোচ সাহস মাপতেন। আজ সফটওয়্যার দৌড়ের গতি মাপে। একসময় সমর্থক ছিল মানুষ। আজ সেও ডেটা। তার পছন্দ— ডেটা। তার অভ্যাস— ডেটা। তার ক্রয়ক্ষমতা— ডেটা। একবিংশ শতাব্দীর ফুটবলে ডেটাও এক ধরনের তেল। আর যার হাতে তেল থাকে, ক্ষমতাও অনেক সময় তার হাতেই যায়।

এই বিশ্বকাপ আমাদের আরেকটা সত্যও মনে করিয়ে দিয়েছে। ফুটবল এবং রাজনীতি আলাদা মহাদেশ নয়। ফিফা বহুদিন ধরে বলে এসেছে— রাজনীতি মাঠের বাইরে থাকুক। কিন্তু ইতিহাস জানে, ফুটবল কখনও মাঠের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুসোলিনি তা জানতেন। ফ্রাঙ্কো তা জানতেন। পিনোশে তা জানতেন। সামরিক জুন্টারাও তা জানত।
কর্পোরেটগুলোও তা জানে। রাষ্ট্রগুলোও তা জানে। ফিফাও তা জানে। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভাষাকে কেউই রাজনীতির বাইরে রাখতে চায় না।

এই বিশ্বকাপে ইরান সেই সত্যের এক অস্বস্তিকর স্মারক হয়ে উঠেছিল। ইরান খেলেছিল। কিন্তু ইরানকে শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলতে হয়নি। তাদের খেলতে হয়েছে সীমান্তের বিরুদ্ধেও। ভিসার বিরুদ্ধেও। নিরাপত্তা নীতির বিরুদ্ধেও। রাজনীতির বিরুদ্ধেও।
মাঠে প্রতিপক্ষ ছিল এগারোজন। মাঠের বাইরে প্রতিপক্ষ ছিল আরও অনেক। মার্কিন অভিবাসন ও নিরাপত্তা নীতির কারণে ইরানি সমর্থক, সাংবাদিক এবং প্রতিনিধিদের যাতায়াত ও অবস্থান নিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল।

ইরানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিফা ছিল দ্রুত। কিন্তু যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানালেন, তখন সেই দৃঢ়তার অনেকটাই মিলিয়ে যেতে দেখা গেল। যে লাল কার্ড একসময় নীতির প্রতীক বলে মনে হয়েছিল, তা ক্ষমতার করিডরে গিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল। নিয়মের ভাষা তখন আর সবার জন্য সমান রইল না। আবারও প্রমাণ হলো— ফুটবল আইনের বইও কখনো কখনো ভূ-রাজনীতির অভিধান থেকে নির্দেশ ধার করে।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— যদি বিশ্বকাপ সত্যিই সবার হয়, তাহলে পৃথিবীর সব পাসপোর্ট কি সমান?

যদি এটা ফুটবলের বিশ্বকাপ সত্যিই হয়, তাহলে পৃথিবীর সব নাগরিক কি সমানভাবে এই উৎসবে অংশ নিতে পারে? ফিফা বলে, ফুটবল কাউকে বাদ দেয় না। কিন্তু পৃথিবীর বিমানবন্দরগুলো সবসময় সেই ভাষা বোঝে না। ভিসা অফিসগুলোও বোঝে না। সীমান্তরক্ষীরাও বোঝে না। আর ফিফাও চোখ বুঁজেই থাকে। ফলে অনেক সময় রাজনীতি স্টেডিয়ামে টিকিট ছাড়াই ঢুকে পড়ে।

ফুটবলের মাঠের বলের আকার গোল। কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্র এখনও অসমান। কেউ জন্মায় শক্তিশালী পাসপোর্ট নিয়ে। কেউ জন্মায় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। কেউ জন্মায় স্পনসর নিয়ে। কেউ জন্মায় সন্দেহ নিয়ে। কেউ জন্মায় বিশ্বায়িত বাজারের কেন্দ্রে। কেউ জন্মায় তার প্রান্তে।
তবে এখনও ফুটবল কখনও কখনও এই অসম পৃথিবীকে কয়েক ঘণ্টার জন্য সমান করে দেয়। হয়তো সেই কারণেই মানুষ এখনও তাকে ভালোবাসে।

এই বিশ্বকাপ আরেকটি বিষয়ও দেখিয়েছে। যদি ফুটবল পুরোপুরি অর্থনীতির নিয়ম মেনে চলত, তাহলে সবচেয়ে ধনী দেশই সবসময় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতো। তাহলে স্টেডিয়ামের প্রয়োজন হতো না। একটি হিসাবের খাতাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য হলো— সে অর্থনীতির হিসাব মানে না। সে জিডিপি মানে না। সে বাজারমূল্য মানে না। সে ইতিহাসও মানে না।
আর এই সব কারণেই ফুটবল এখনও বিপজ্জনক পরাশক্তিগুলোর কাছে।

কারণ ফুটবল মানুষকে সমতার স্বপ্ন দেখায়। কারণ ফুটবল মানুষকে বিশ্বাস করায় যে ছোটরাও জিততে পারে। কারণ ফুটবল মানুষকে শেখায় যে ক্ষমতা সবসময় জয়ী হয় না। সীমান্ত সবসময় শেষ কথা বলে না। এবং ইতিহাস চিরকাল একই দিকে হাঁটে না।

ডিআর কঙ্গোর একটি শিশু এখনও স্বপ্ন দেখে। কেপ ভার্দের একটি দ্বীপ এখনও বিশ্বাস করে। কাসাব্লাঙ্কার কোনও গলিতে এখনও গোলপোস্ট বানাতে দু’টো ইটই যথেষ্ট। ডাকারের কোনও রাস্তায় এখনও বল গড়িয়ে যায়। আলজিয়ার্সের কোনও ছাদে এখনও সন্ধ্যা নামে ফুটবলের শব্দে। কোচবিহার-কলকাতা-কাকদ্বীপের কোনো গলিতে-মাঠে এখনও বিকেলের আলো ফুটবলের জন্য থেমে যায়।

কর্পোরেটরা সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে পারে। স্টেডিয়ামের নাম কিনতে পারে। জার্সির বুক কিনতে পারে। অ্যালগরিদম কিনতে পারে। ডেটা কিনতে পারে। কিন্তু তারা এখনও স্বপ্নের মালিক হয়নি। কারণ পৃথিবীর দক্ষিণে এখনও বহু মানুষ আছেন, যারা জানেন না বাজারমূল্য কী! জানেন না স্পনসরশিপ কী! জানেন না সম্প্রচার স্বত্ব কী! তারা শুধু জানেন, বলটাকে লাথি মারলে তা গড়িয়ে যায়। আর সেই গড়িয়ে যাওয়া বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ কখনও কখনও নিজের স্বাধীনতার কাছেও পৌঁছে যায়।

যে কোনও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় উপহার ট্রফি নয়, অনেক কিছুর স্মৃতি। সে স্মরণ করিয়ে দেয়— পৃথিবীর দক্ষিণ এখনও কথা বলতে পারে। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য আর শুধু কাঁচামালের মহাদেশ নয়, ফুটবলেরও এক নতুন কেন্দ্র। অভিবাসীদের সন্তানরা এখনও ইতিহাস লিখতে পারে। ছোট পতাকাগুলো এখনও বড় পতাকার পাশে দাঁড়াতে পারে। কর্পোরেট এখনও সবকিছু কিনে নিতে পারেনি।

বল এখনও গোল। আর গোল বলের পুরানো এক অভ্যাস আছে। সে সবসময় ক্ষমতার পায়ের কাছে গিয়ে থামে না। কখনও সে মরক্কোর দিকে গড়িয়ে যায়। কখনও কঙ্গোর দিকে। কখনও কেপ ভার্দের দিকে। কখনও এমন কোনো শিশুর দিকে, যে এখনও বিশ্বাস করে পৃথিবীকে পায়ের সাহায্যেও বদলানো যায়। কারণ মারাদোনা-মেসির পা তাঁদের কাছে স্বপ্ন। কারণ ফুটবল পৃথিবীর দক্ষিণেরও পায়ের শব্দ। আর পৃথিবীর দক্ষিণের পায়ের শব্দ বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে। ইতিহাসের দীর্ঘ করিডরে, শেষ পর্যন্ত, সেই শব্দই অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।

এই বিশ্বকাপ শুধু ক্ষমতার গল্প নয়। এ অসমতার গল্পও। আফ্রিকার পদচারণা যেমন ছিল বিস্ময়কর, তেমনি এশিয়ার জন্য এই বিশ্বকাপ ছিল আত্মসমালোচনার আয়না। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়া এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এখনও ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কাঠামো, ঘরোয়া লিগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কিংবা ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। অর্থ ঢাললেই ফুটবল তৈরি হয় না; ফুটবল তৈরি হয় মাঠে, পাড়ায়, স্কুলে, ক্লাবে, কোচের ধৈর্যে, সমর্থকের বিশ্বাসে। জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সেই পথেই বহু বছর হাঁটছে। এশিয়ার বাকি দেশগুলোর সামনে এখনও সেই দীর্ঘ পথ অবহেলায় পড়েই আছে।

আজ ১৯ জুলাই। আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। এমন একটা ফাইনাল, যা শুধু দু’দলের লড়াই নয়; দুই ফুটবল-দর্শনেরও মুখোমুখি হওয়া। একদিকে লাতিন আমেরিকার কল্পনা, আবেগ, অপ্রত্যাশিত সৌন্দর্য। অন্যদিকে ইউরোপীয় শৃঙ্খলা, গতি, সংগঠন, নিখুঁত অঙ্ক এবং আধুনিকতার স্থাপত্য। কে জিতবে, তার উত্তর ৯০ কিংবা ১২০ মিনিটের কাছে আছে। কিন্তু তার আগেই আমাদের সকলের জিতে নেওয়ার সুযোগ আছে— খেলার আনন্দ। কারণ শেষ পর্যন্ত ট্রফি কোনও এক দেশের হাতে যায়, কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য সবার কাছে থেকে যায়।


আজকের ফাইনাল নিয়ে, দল নিয়ে তর্ক চলবে, প্রিয় খেলোয়াড়ের নামে চিৎকারও হবে, গোল হলে ৬০০ কোটি বিশ্ববাসীর সঙ্গে চিৎকারও হবে, আবার হারের কষ্টও ভাগ করে নিতে হয়। কিন্তু সবকিছুর আগে মনে রাখতে হয়— ফুটবল আমাদের সবার।

ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর খেলা, কারণ এটা এখনও সম্পূর্ণভাবে বাজারের দখলে যায়নি। এখনও কোনও শিশুর খালি পা বলকে এমনভাবে ছুঁতে পারে, যা কোনো অ্যালগরিদম আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। এখনও কোনও গলির দুই ইটের গোলপোস্ট বিলিয়ন ডলারের স্টেডিয়ামের চাইতেও অনেক বড় স্বপ্ন তৈরি করে। এখনও গ্যালারির মানুষের গান কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি সত্য।

কর্পোরেটগুলো হয়তো সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে পারে। স্টেডিয়ামের নাম কিনতে পারে। জার্সির বুক কিনতে পারে। খেলোয়াড়ের বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু তারা এখনও মানুষের বিস্ময় কেনেনি। কেনেনি সেই মুহূর্ত, যখন একটি শিশু প্রথমবার বলটাকে লাথি মেরে বিশ্বাস করে — পৃথিবী বদলানোও হয়তো সম্ভব।

এই কারণেই ফুটবল এখনও সাধারণ মানুষের খেলা। এখনও শ্রমিকের খেলা। চাষির খেলা। এখনও উদ্বাস্তুর খেলা। এখনও বন্দর শহরের, পাহাড়ি গ্রামের, মরুভূমির, বস্তির, মফস্বলের, কোচবিহার-কলকাতা-কাকদ্বীপের এক ফালি জায়গা থেকে কাসাব্লাঙ্কার অলিগলি পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের খেলা।

আর সেই কারণেই, পৃথিবীর দক্ষিণের পায়ের শব্দ এখনও থামেনি। বরং আরও জোরে শোনা যাচ্ছে। পৃথিবীর দক্ষিণ মানে মানচিত্রের নিচের অংশ নয়। এ সেইসব মানুষের ভূগোল, যাদের শ্রমে পৃথিবী সমৃদ্ধ হয়েছে, অথচ সম্পদ ও ক্ষমতার বণ্টনে তারা সবচেয়ে কম অংশ পেয়েছে। ইতিহাস তাদের অনেকবার পরাজিত লিখেছে; ফুটবল মাঝে মাঝে সেই ইতিহাসকেই পালটে দেয়। ইতিহাসের দীর্ঘ করিডরে, ক্ষমতার প্রাসাদের দেয়াল পেরিয়ে, বাজারের কোলাহল ছাপিয়ে— সেই শব্দ এখনও বলে যায়, পৃথিবীকে কখনও কখনও পায়ের সাহায্যেও বদলানো যায়।

Comments :0

Login to leave a comment