JOURNEY — AVIK CHATARJEE — SHOLOYANA NIZAMIYANA — MUKTADHARA — 2026 APRIL 11, 3rd YEAR

ভ্রমণ — অভীক চ্যাটার্জী — ষোলোআনা নিজমিয়ানা — মুক্তধারা — ২০২৬ এপ্রিল ১১, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

JOURNEY  AVIK CHATARJEE  SHOLOYANA NIZAMIYANA  MUKTADHARA  2026 APRIL 11 3rd YEAR

ভ্রমণ

মুক্তধারা

ষোলোআনা নিজমিয়ানা
 

অভীক চ্যাটার্জী 

২০২৬ এপ্রিল ১১, বর্ষ ৩

ঘরে ফেরার গান


ধীরে ধীরে আমার হায়দরাবাদের দিন শেষ হয়ে আসছিল। নতুন কর্মচারী নিয়োগের কাজও প্রায় সম্পূর্ণ। আমি তার উপর অফিসের দায়িত্ব ছেড়ে একদিন ছুটি নিয়ে ঘুরতে বেরোলাম আশেপাশে। সে সময় দেখা দুটো দর্শনীয় জায়গার কথা আজ আমাদের গল্পের মূল উপজীব্য।

প্রথমটি হলো চৌমহল্লা প্যালেস। চৌমহল্লা প্যালেস ছিল হায়দরাবাদের নিজামদের রাজকীয় আবাস ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। এর নির্মাণ শুরু হয় প্রায় ১৭৫০ সালে নিজাম সালাবত জং-এর সময়ে এবং পরবর্তীতে উনবিংশ শতকে এটি সম্পূর্ণ রূপ পায়।“চৌমহল্লা” শব্দের অর্থ “চারটি প্রাসাদ”, যা এই বিশাল প্রাসাদ কমপ্লেক্সের চারটি প্রধান অংশকে নির্দেশ করে। এখানে নিজামরা দরবার বসাতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন।দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার পর ২০০৫–২০১০ সালের মধ্যে এটি পুনরুদ্ধার করা হয় এবং এখন এটি একটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে রাজকীয় সামগ্রী, গাড়ি ও ঝাড়বাতি প্রদর্শিত হয়।এখানকার খিলওয়াত মুবারক হল (Durbar Hall) ছিল নিজামদের সিংহাসনের আসন—এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।প্রাসাদের ঝাড়বাতিগুলো বেলজিয়াম থেকে আনা, এবং আজও সেগুলো অন্যতম আকর্ষণ।এখানে থাকা ভিন্টেজ গাড়ির সংগ্রহ নিজামদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রমাণ দেয়।এটি ভারতের প্রথম প্রাইভেট প্যালেসগুলোর মধ্যে একটি, যা UNESCO Heritage Award পেয়েছে ২০১০ সালে।

আর দ্বিতীয়টি হলো সালারজাং মিউজিয়াম। সালার জং মিউজিয়াম ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্প জাদুঘর, যা ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত মীর ইউসুফ আলি খান (সালার জং তৃতীয়)-এর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে গড়ে ওঠে, যিনি হায়দরাবাদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
তিনি সারা পৃথিবী থেকে নানা শিল্পকর্ম, প্রাচীন বস্তু ও মূল্যবান সংগ্রহ সংগ্রহ করেছিলেন।
এই জাদুঘরে হাজার হাজার শিল্পকর্ম রয়েছে—যেমন ভাস্কর্য, চিত্রকলা, পাণ্ডুলিপি, ঘড়ি ও অলঙ্কার। এর মধ্যে বিখ্যাত “Veiled Rebecca” ভাস্কর্য এবং বিভিন্ন যুগের ঘড়ির সংগ্রহ বিশেষ আকর্ষণ।আজ এটি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই সংগ্রহশালা মূলতঃ নিজামের সংগ্রহকে প্রদর্শিত করে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় “one-man collection” মিউজিয়াম—একজন মানুষের সংগ্রহেই গড়ে উঠেছে!এখানে প্রায় ৪০,০০০ এরও বেশি আর্টিফ্যাক্ট এবং ৫০,০০০এরও বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।
বিখ্যাত ভাস্কর্য “Veiled Rebecca” এমনভাবে খোদাই করা যে মার্বেলের উপর কাপড়ের মতো আবরণ মনে হয়—এটা এক শিল্পকৌশলের বিস্ময়।মিউজিয়ামের মিউজিক্যাল ক্লক প্রতি ঘণ্টায় ছোট্ট একটি মূর্তি বেরিয়ে এসে ঘণ্টা বাজায়—এটি দর্শকদের বিশেষ আকর্ষণ।এখানে একটি অদ্ভুত ভাস্কর্য আছে—“Double Statue”, যা সামনে থেকে একরকম, পিছন থেকে আরেকরকম দেখায়!বিশ্বের নানা দেশ—ইউরোপ, চীন, জাপান, পারস্য—সব জায়গার শিল্পকর্ম এখানে একসাথে দেখা যায়।

অদ্ভুত এক মাদকতা আছে এই। শহরের পথে পথে। অদ্ভুত এক বেঁচে থাকা যেনো বাঁচিয়ে রাখে রোজ। প্রতিটা ক্লান্ত দিন যেনো যেতে যেতেও দিয়ে যায় নতুন দিনের উদ্যম। হায়দরাবাদ হয়ে ওঠে আমার আরও এক বেঁচে থাকার শহর।

পরিবার থেকে দূরে আরও এক পরিবারের সাথে কাটানো এই চার মাস আমার এক অন্য যাপন। আজও যখন হায়দরাবাদের কথা ওঠে, আমি আরও একবার ভাবুক হয়ে যাই। মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো গোলিঘুজি। মনে পড়ে সেই মেট্রো রেলের যাত্রাপথ। আর মনে পড়ে গন্ধ। সে শহরের এক গন্ধ আছে। আমি বুকে করে বাঁচি। আতরের মোড়কে ঢেকে রাখা তুলোর আবেশে আগলে রাখা আমার পরম যত্নে স্মৃতির গন্ধ। কোনো কোনো নিঝুম দুপুরে চুপি চুপি সে মোড়ক খুলে শুঁকে দেখি সে গন্ধ। আরও একবার আমার বুকে বেঁচে ওঠে আমার প্রাণের হায়দরাবাদ।

সমাপ্ত

Comments :0

Login to leave a comment