প্রতীম দে : সোনারপুর
নিউ গড়িয়া থেকে গড়িয়া যাওয়ার পথে পড়ে গড়াগাছা। ছোট্ট একটা এলাকা। ওই এলাকায় রয়েছে একটি আদিবাসী পাড়াও। সেখানে লোকজন থাকেন, তারা ভোটও দেন। প্রতিবছর ভোট আসে। প্রতিশ্রুতি দেয় শাসক দল। কিন্তু তাদের উন্নতি কিছু হয় না। নিউ গড়িয়া সংলগ্ন বড় বড় হাউসিং গুলোর পাশে এক প্রকাশ অবহেলায় পড়ে আছে ওই আদিবাসী পাড়া।
সোনারপুর উত্তর বিধানসভার সিপিআই(এম) প্রার্থী মোনালিসা সিনহা যখন ওই এলাকায় প্রচার করছেন তখন বিকেল। সূর্য ডুবেছে। আলো আছে। বাড়ির মহিলারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। মোনালিসা সিনহা যাচ্ছেন। তাদের সাথে কথা বলছেন।
সিপিআই(এম) কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলছেন, ‘লাল পার্টির লোক এসেছে, আসো’ সবাই বাইরে আসছে। তাদেরই মধ্যে একজন মণিকা কোনার। বয়স ৮০’র বেশি। চোখ ঘোলাটে। চোখের চশমাটাও ঠিক নেই। লাঠি হাতে এগিয়ে এলেন সিপিআই(এম) প্রার্থীর দিকে।
ইঁদুরের মাংস খাওয়া আদিবাসী সমাজের মানুষ গুলোকে সমাজের মূল স্রোতে এনেছিল বামফ্রন্ট। তৈরি হয়েছিল রাস্তা। ছেলে মেয়েরা স্কুলে গিয়েছিল। আজ তারা অনেকেই চাকরি করেন।
মোনালিসা সিনহার দিকে তাকিয়ে একটু জোড় গলায় বললেন, ‘পেটে ভাত নেই, কাকে ভোঁট দেবো?’
বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছিলেন কিন্তু হয়নি। রেশন থেকেও চাল পায়। সংসারের নুন আনতে পান্তা ফোরায়।
বৃদ্ধার কথায়, ‘আমি অতো জানি না। তৃণমূল পার্টির লোকেরা এসেছিল বলেছিল করে দেবে তারপর আর করে দেয়নি।’
একা মণিকা কোনার নয় ওই প্রান্তিক এলাকার বহু মানুষ পায় না লক্ষ্মীর ভান্ডার, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতার মতো প্রকল্পের সুবিধা। কিন্তু তৃণমূল তাদের ভয় দেখায় ‘দিদি না থাকলে সব বন্ধ হয়ে যাবে।’
সিপিআই(এম) প্রার্থীর কথায়, ‘তৃণমূল সোনারপুর উত্তরের মানুষকে রোজ বোকা বানাচ্ছে। গোটা রাজ্যেই তারা এই কাজ করছে। মানুষকে এখানে ভয় আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। ওরা ভয় দেখাচ্ছে লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা বামপন্থীরা বলছি কোন সরকারি প্রকল্প বন্ধ হবে না। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের নাম করে তৃণমূল যেই চুরি করছে তা বন্ধ হবে। এছাড়াও মহিলারা যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে উপার্জন করতে পারেন তার জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলোকে উন্নত করা হবে।’
সোনারপুর রাজপুর পৌরসভার কিছুটা অংশ এবং তার সাথে দুটি পঞ্চায়েত নিয়ে সোনারপুর উত্তর বিধানসভা এলাকা। ২০১১ সাল থেকে এই এলাকায় তৃণমূলের কাউন্সিলর ফিরদৌসি বেগম। ছিলেন কাউন্সিলর। তারপর বিধায়ক। এলাকায় কান পাতলেই শোনা যায় ফিরদৌসি নামেই বিধায়ক, যাবতীয় কাজ চালায় তার স্বামী। তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ সহ একাধিক অভিযোগ। ভোটের দিন মানুষকে ভোট দিতে না দেওয়ায় হয় তারই নেতৃত্বে।
১৫ বছরে তৃণমূলের বিধায়ক এলাকার উন্নতির জন্য কোন কাজ করেননি। রাস্তার হয়নি। নতুন করে কোন সরকারি স্কুল হয়নি। রয়েছে জলের সমস্যা।
গড়াগাছা আদিবাসী পাড়াকেই দেখা যাক। খালের পাশেই এলাকা। ২০১১ সালের আগেই বামফ্রন্ট পরিচালিত পৌর বোর্ড ঢালাই রাস্তা তৈরি করেছিল। তারপর থেকে আর নতুন করে কিছু হয়নি ওই এলাকায়। অনেক বাড়ি রয়েছে যেই গুলো কাঁচা। সেই বাড়ি গুলো পায়নি আবাস যোজনার টাকা। বাংলা আবাস যোজনার টাকাও তারা পায়নি।
কেন টাকা পায়নি তা কেউ জানে না। কিন্তু আবেদন তারা করেছে।
তৃণমূল বিধায়ক কি কাজ করলো এলাকায়? স্থানীয় রিক্সা চালক ভজন সরদারের কথায়, ‘কাজ! কাজের থেকে অকাজ বেশি করেছে। এখানে কোন কাজ হয়নি। সবাই এখানে ভোট দিতে পারে না। ভয় ভয় দিন কাটাতে হয় আমাদের। কোন কথা বলা যায় না তৃণমূলের বিরুদ্ধে।’
নয়াবাদের যেই ওয়াও মোমো কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৩০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে সেই কারখানাও এই বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে। মোনালিসার কথায়, বেআইনি নির্মান, প্রকৃতি ধ্বংস এই এলাকায় শুরু হয়েছে তৃণমূলের আমলেই। নেতৃত্বে বিধায়ক এবং তার স্বামী। তৃণমূলের এই কাজের জন্য অতো গুলো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর দায় শাসক দলকে নিতে হবে।
রাজ্যে ‘পরিবর্তনের’ পর থেকে সোনারপুর এলাকার একাধিক জায়গায় বামপন্থীদের ওপর হয়েছে আক্রমণ। গড়াগাছাও তাদের মধ্যে একটি। সেখানে বার বার আক্রান্ত হয়েছেন বামপন্থী কর্মীরা।
সিপিআই(এম) প্রার্থীর কথায়, ‘মানুষ এই অপশাসনের হাত থেকে পরিত্রান চাইছে। বামপন্থীরা প্রান্তিক অংশের মানুষের জন্য যা করেছিল তার আর কিছু হয়নি। তৃণমূল কখনও গরীব মানুষের হয়ে কাজ করেনি। তাদের ব্যবহার করেছে ভোটের স্বার্থে।’
বিজেপির প্রভাব রয়েছে। রয়েছে বাইনারিও। এর মোকাবিলায় সিপিআই(এম) প্রার্থীর হাতিয়ার তৃণমূল বিজেপির সেটিং। বিজেপি তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের কী ভাবে রক্ষা করছে তা তিনি বলছেন। তার সাথে বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির কথা। সেই মূল্যবৃদ্ধির নিয়ন্ত্রণে রাজ্য সরকারের যেই ব্যার্থতা তাও বলছেন সিপিআই(এম) প্রার্থী।
রুজি-রুটি, কর্মসংস্থানের কথাকে সামনে রেখেই প্রচার চালাচ্ছেন সিপিআই(এম) প্রার্থী। তার কথায়, আক্রমণ হবে। তার পাল্টাও দেওয়া হবে। মানুষ এবার সোনারপুর উত্তরে নিজের ভোট নিজে দেবেন। কোন হিন্দু মুসলমি নয়। মানুষ তার অধিকার বুঝে নেবেন এবারের নির্বাচনে। আর তাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের সাথী একমাত্র বামপন্থীরাই।
Comments :0