ভ্রমণ
মুক্তধারা
বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
সুমন চ্যাটার্জী
২০২৬ এপ্রিল ১৮, বর্ষ ৩
প্রথম পর্ব
যে কোনো শহরকে দূর থেকে দেখলে তাদের আর দশটা শহরের সঙ্গে প্রায় একইরকম মনে হয়—মসৃণ বা বাঁধানো রাস্তাঘাট, বড় বড় বাড়ি আর প্রচুর মানুষ; সেইভাবে কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। কিন্তু সবসময়ই, এইসব দেখার পাশাপাশি একটা আবছা ছবি থাকে, যা হয়তো প্রথমে নজরে চোখে পড়ে না। প্রাথমিক মুগ্ধতা কেটে যাওয়ার পর, যখন চোখ ধীরে ধীরে সয়ে আসে, তখন সেই লুকানো বা আবছা ছবিগুলো ধীরে ধীরে চোখে ধরা দেয়।
প্রাগ, ভিয়েনা, ইস্তাম্বুল—এই তিনটি শহরের নাম একসঙ্গে দেখলে কোনো সূত্রই খুঁজে পাওয়া যায় না; তিনটি আলাদা দেশের তিনটি বৃহৎ শহর, যাদের মধ্যে কোনো ভৌগোলিক যোগাযোগ নেই। কিন্তু খানিকটা তলিয়ে দেখলেই সেই হালকা সংযোগসূত্রগুলো চোখের সামনে ফুটে ওঠে।
নিকট অতীতে, একটি নির্দিষ্ট সময়কালে, তিনটি শহর, তিনটি সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে অভ্যস্ত ছিল। একটি শহর ছিল লৌহপর্দার অন্তরালে, একটি তার সীমারেখায়, এবং অপরটি বহুদূরে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই এই পার্থক্য আপাতদৃষ্টিতে ধরা পড়ে না, কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে যায়—পুরনো বাসস্টপের দেয়ালে, লুকিয়ে থাকা কোনো ছোট গলির সাইনবোর্ডে, কিংবা কোনো সমকালীন ভবনের কাঁচে। পুরনো স্মারক সরিয়ে ফেলা যায়, পার্কের মূর্তি অন্ধকার কোণে লুকিয়ে রাখা যায়, কিংবা বাড়িঘরের রং বদলে বাহ্যিক পরিবর্তন আনা যায়; কিন্তু ইতিহাস রং করা দেওয়ালের মধ্য দিয়েও নখের আঁচড়ের মতো বারবার বেরিয়ে আসে।
এই ধারাবাহিক লেখাটি কোনো ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়—অন্তত সেভাবে নয়, যেভাবে কোনো শহরে ঘুরতে গিয়ে ট্রাভেল ব্লগাররা তা তুলে ধরেন। আবার এটি ইতিহাসও নয়। বরং এটি এক প্রচেষ্টা—এই শহরগুলির সেই লুকিয়ে থাকা, সরিয়ে রাখা বা ভুলে যাওয়া ইতিহাসের অংশগুলোকে খুঁজে বের করার; সেই আলোয় শহরগুলোকে দেখার এবং বোঝার; কোথাও থেমে, আবার কোথাও ফিরে তাকিয়ে।
সবকিছু হয়তো সবসময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। বরং সেই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিই প্রয়োজন, যা বুঝতে সাহায্য করে—কীভাবে একটি শহর নিজের অতীতকে বহন করে এগিয়ে চলে; কখনও চোখের সামনে, কখনও আড়ালে, আবার কখনও এমনভাবে যে চোখের সামনে থাকলেও তা আলাদা করে ধরা পড়ে না।
Comments :0