২০১৬ সালে নোটবন্দি এবং পরের বছর তড়িঘড়ি জিএসটি চালু করে ছোট ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসায়িক সংস্থাগুলি যখন গুরুতর সঙ্কটের মুখে পড়ে তখন প্রবল সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে মোদী সরকার চমকপ্রদ প্রচার শুরু করে দেশের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ণ হবার আগেই কৃষকদের আয় দ্বি’গুণ করা হবে। এখন আর ভুলেও কেউ কৃষকের আয় বৃদ্ধির কথা উচ্চারণ করে না। বাস্তবে আয় বৃদ্ধির রঙিন স্বপ্ন ফেরি করে তার আড়ালে আচমকা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তিনটি কৃষক ও কৃষি বিরোধী আইন পাশ করে কৃষকদের কার্যত কৃষির অধিকার এবং জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়। দেশের কৃষি ও কৃষকের ভবিষ্যৎ কর্পোরেট পুঁজির হাতে তুলে দেবার সেই আইন শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় কৃষকদের বৎসরাধিককাল দিল্লিতে অবস্থান-বিক্ষোভের জেরে।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে নতুন জুমলার প্রচার শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে। প্রথম দিকে বলা হয় স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তির আগেই দেশের অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হয়ে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। পাশাপাশি এই প্রচার জোরালো করা হয় যে ভারত দ্রুততার সঙ্গে পঞ্চম ও চতুর্থ স্থান অতিক্রম করে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে। গত দুই-তিন বছর ধরে অর্থনীতি সংক্রান্ত প্রচারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায় ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ হারে বৃদ্ধির অর্থনীতি হিসাবে। মাঝখানে প্রায় তিরিশটি শ্রম আইন ও শিল্প সম্পর্ক আইন বাতিল করে চালু করা হয় চারটি শ্রমকোড। বলা হয় এর ফলে দেশের শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং তাদের কাজের শর্ত ও আয় বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবে শ্রমিকদের কেমন উন্নতি হচ্ছে তার নমুনা দেখা গেছে নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। শ্রমকোড চালু হবার একাধিক ক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ বেড়েছে। শিল্পক্ষেত্রে কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা শোচনীয় আকার নিয়েছে। বেদান্তের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিস্ফোরণে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই। দুঃসহ পরিবেশে ন্যুনতম মজুরির অতিরিক্ত সময় তাদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়। চার শ্রমকোড মালিকদের শ্রমশোষণের অধিকার ও অতিমাত্রায় মুনাফার স্বার্থ সুরক্ষিত করলেও শ্রমিকদের কোনও স্বার্থ রক্ষা করেনি।
আইএমএফ’র সর্বশেষ জিডিপি সংক্রান্ত রিপোর্ট থেকে নরেন্দ্র মোদী জুমলাবাজি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশ্বের পঞ্চম, চতুর্থ ও তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবার বেলুন ফুটো হয়ে গেছে এই রিপোর্টে। তৃতীয় বৃহত্তম তো অনেক দূরের ব্যাপার এতদিন চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি বলে যে প্রচার করে মোদীর সাফল্যের তাসের ঘর বানানো হচ্ছিল এক ঝটকায় তা ধসে গেছে। আইএমএফ জানিয়েছে চতুর্থ নয় ভারত আসলে ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি। যথাক্রমে আমেরিকা, চীন, ব্রিটেন, জাপান ও জার্মানির পেছনে। তেমনি স্বাধীনতার ৭৫ বছরের আগে এমনকি ২০২৪-২৫ সালেও পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হয়নি। বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির আয়তন ৩-১২ ট্রিলিয়ন ডলার। মোদী জমানায় ডলার সহ অন্যান্য বিদেশি মুদ্রার তুলনায় টাকার মূল্য যেভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং মূল্যবৃদ্ধির হার যেভাবে চড়ছে তাতে মোদীর রাজত্বকালে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
Editorial
মোদী মানেই জুমলা
×
Comments :0