শুভা মিত্র
প্রতিবারের মতোই এবারের নির্বাচনেও বামপন্থী দলগুলির জয়ের সম্ভাবনা কতটা তাই নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সেটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। প্রশ্ন থাকবে, বিতর্ক হবে, ইতিবাচক, নেতিবাচক নানান কথা আসবেই। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রয়োজন প্রশ্নের তালিকা বাড়ানো নয়— সরাসরি সম্ভাব্য উত্তরের দিকে এগানো। কারণ রাজনীতিতে শূন্যস্থান থাকে না। এবং যখন দুই প্রধান শক্তির প্রতি অসন্তোষ একসাথে জমতে শুরু করে, তখন তৃতীয় শক্তি অর্থাৎ বামশক্তির উত্থান আর তত্ত্ব থাকে না— তা হয়ে ওঠে সম্ভাবনার দলিল। পশ্চিমবঙ্গের মতদাতারা ২০১৬ সালের পর থেকে মূলত তৃণমূল-বিজেপি দুই মেরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ। একদিকে তৃণমূল বিরোধী ভোট, অন্যদিকে বিজেপি বিরোধী ভোট। গত কয়েকটি নির্বাচনে আমরা দেখেছি— এই দুই মেরুর মধ্যে দোলাচলই নির্ধারণ করেছে ফলাফল। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে বিজেপি-কে ভোট, আবার বিজেপি’র বিরুদ্ধে উদ্বেগ থেকে তৃণমূলকে সমর্থন। এই ভোটের বড় অংশই সাময়িক এবং কৌশলগত, মতাদর্শভিত্তিক তো নয়ই, জনজীবনের দাবি-দাওয়ার প্রতিফলনেও নয়। অর্থাৎ, ভোটার তাঁর পছন্দের দলকে ভোট দেননি— তিনি ভোট দিয়েছেন এমন একটি শক্তিকে, যাকে তিনি অন্য পক্ষকে হারানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করেছেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল— তৃতীয় শক্তি জিততে পারবে না। এই ধারণাই ২০১৯ লোকসভা থেকে বঙ্গ রাজনীতিতে এই ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পিত নীল নলশা অনুযায়ী। এবং যা বহু সেটিংয়ের ফলাফলে তৈরি করা এই ভিত্তি। এবার সেই ভিত্তিতেই ফাটল ধরছে।
এখনও ভোটার তালিকার গোলমালের কারণে সব কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি বা, বলা চলে নির্দিষ্ট হয়নি। তবে সংখ্যার অঙ্ক খুব জটিল নয়। মোট সাত কোটি ভোটারের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ কোটি মানুষ ভোট দেবেন। এই পাঁচ কোটির মধ্যে শেষ কয়েকটি নির্বাচনের নিরিখে দেখা যাচ্ছে আপাত তৃতীয় শক্তি বামপন্থীদের স্থায়ী ভোট পঁচাত্তর লক্ষের মতো। কিন্তু এর বাইরে রয়েছে একটা বড় অংশের ভোট, যা আদর্শের তো নয়ই জনদাবির ভরসাতেও নয়– একেবারেই অসন্তোষের কারণে। এক ফুলের ওপর রাগ, তাই অন্য ফুলে ভোট। এই বড় সংখ্যার দোদুল্যমান ভোটই এবারের নির্বাচনে মোড় ঘোরাবে। যদি বিশ্বাস না হয়, পরীক্ষা প্রার্থনীয়। নিজের চারপাশে বেশ কয়েকজন অচেনা ভোটারের সঙ্গে কথা বলুন। তার অন্তত অর্ধেক বলবেন— তাঁরা ভালোবেসে কোনও এক ফুলকে ভোট দেননি, দিয়েছেন বাধ্য হয়ে, বিরক্ত হয়ে। এই বিরক্তি এবং বাধ্যতার ভোটই সবচেয়ে অস্থির। এবং অস্থির ভোটই অতিদ্রুত সরে যায়।
আরেকটা যে প্রশ্ন ওঠে বা তোলা হয়, তা হলো ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে এই দোদুল্যমান অংশের ভোটের কি অন্যদিকে সরে যাওয়া কি সম্ভব? ইতিহাসের উদাহরণ বলছে— সম্ভব, এবং খুব দ্রুত সম্ভব। ২০১৬ সালে বিজেপি’র ভোট ছিল আশি লক্ষেরও কম। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে, ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে সেই ভোট বেড়ে দাঁড়ায় দু’কোটি তিরিশ লক্ষের সামান্য বেশি এবং কম (যথাক্রমে)। অর্থাৎ দেড় কোটিরও বেশি ভোট বেড়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। তাহলে আজকের দিনে একটা বড় অংশের ভোটের পুনর্বিন্যাস অসম্ভব কেন? বরং বাম দলগুলির কাছে পরিস্থিতি ইতিবাচক। কারণ এইবার ভোটদাতারা শুধু একপক্ষের বিরুদ্ধে নয়— দুই পক্ষের প্রতিই সমানভাবে বিরক্ত। এই দ্বিমুখী অসন্তোষই তৃতীয় শক্তির আশা এবং এখানেই সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের অঙ্কটি গুরুত্ব পায়। দ্বিতীয় এবং একটা উল্লখযোগ্য কারণ এই যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দাবি নিয়ে মানুষের পাশে ধারাবাহিকভাবে রাস্তায় থেকেছেন একমাত্র বাপন্থীরাই। কাজের প্রশ্নে হোক, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্যের জন্য লড়াই কিংবা ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষায়, হানাহানি রুখতে সব সময়ই মানুষ দেখেছেন পাশে আছে শুধু বাপন্থীরাই। তৃতীয় শক্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন ভোটদাতারা বিশ্বাস করেন যাদের সমস্য- সঙ্কটে পাশে দেখেন— এবার তাদের জেতা সম্ভব। সেই বিশ্বাসই এখন গড়ে উঠছে স্পষ্টভাবে।
সিপিআই(এম) বা বামপন্থী নেতা কর্মীরা মানুষের সঙ্গে যে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছেন এলাকা ভিত্তিতে মানুষ তা জানেন। তবে সেটা সবসময় সংবাদমাধ্যম বা সমাজমাধ্যমে প্রতিফলিত হয় না। এর একটি কারণ বামপন্থী রাজনীতির চরিত্র। ব্যক্তিগত স্বার্থ, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, চাঁদার জুলুমবাজি বা ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত না রেখে যে রাজনীতি করা হয়, সেখানে “এলাকা লালন” করার প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থটি প্রযোজ্য নয়। নিয়মিত পেশি বা অর্থ সঞ্চালন, পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার যে পদ্ধতি– তার সঙ্গে অবশ্যই বাম রাজনীতির বরাবরের বিরোধ। কিন্তু কোভিডের সময় রেড ভলান্টিয়ার বা শ্রমজীবী ক্যান্টিন, পরিযায়ী শ্রমিকের দুর্দশায় পাশে হাজির হওয়া কিংবা এসআইআর’র উৎপাতে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্যে মানুষের পাশে দাঁড়ানো— এই উদাহরণগুলো কষ্ট করে খুঁজতে হয় না। ভোট পেতে নয়, মানুষের কাজ করার এই রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য বামপন্থীদের স্বাভাবিক চলার পথ। অন্যদিকে, তৃণমূল বা বিজেপি’র মধ্যে যে ধরনের ক্ষমতা-নির্ভর সংগঠন গড়ে উঠেছে, সেখানে স্থানীয় প্রভাব, গোষ্ঠীভিত্তিক সমীকরণ এবং অনেক সময় দুর্নীতি কেন্দ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ভূমিকা বিরাট। ফলে সেই রাজনৈতিক কাঠামোয় “যোগাযোগ” মানে প্রায়শই নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবের ধারাবাহিকতা। এই দুই ধরনের রাজনীতির পার্থক্যটাই আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থাৎ বামপন্থীরা হয়তো সেই অর্থে “এলাকা দখল” করেন না, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক থাকে সংগঠন, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে। সেই সম্পর্ক দৃশ্যমান কম, কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতায় উপস্থিত। ঠিক এই কারণেই, যখন ভোটদতা বাধ্যতার রাজনীতি থেকে বেরোতে চান, তখন তিনি বিকল্প খোঁজেন এমন এক শক্তির মধ্যে, যার উপর তাঁর নৈতিক আস্থা তৈরি হয়ে আছে।
ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি বামপন্থীদের সম্পূর্ণ উল্টো মেরুতে। ফলে রাম-বামের ফুটকি সংক্রান্ত অগভীর আলোচনায় ঢুকে কোনও লাভ নেই। কোনও বাম সমর্থক যদি বিজেপি-কে আগে ভোট দিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তা তৃণমূলকে হারানোর জন্যেই দিয়েছেন— মৌলবাদী হয়ে গিয়ে দেননি। একইভাবে বিজেপি-কে রুখতে কোনও বামপন্থী মানুষ যদি তৃণমূলকে ভোট দিয়ে থাকেন, সেই মানুষটিও তৃণমূলের রাজনৈতিক চরিত্রে মিশে গিয়ে দুর্নীতিপরায়ণ দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠেননি। তাঁদের আবার নিজেদের মূল সমর্থনের জায়গাটিতে ফিরে আসার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। এবং ফিরে আসছেনও। সেই মানুষগুলির দিকেই বামপন্থী নেতাকর্মীরা হাত বাড়িয়েছেন এবং ক্রমশ প্রসারিত করছেন। এই নির্বাচন সেই সোজা পথে ফেরার এবং তার রূপায়ণ মোটেও মহাকাশ বিজ্ঞান নয়। ভোটের দিন একটি বোতামে আঙুল ছোঁয়ানোই যথেষ্ট— যদি না ফুল-জটের কৌশলে হয় ভয় দেখিয়ে ভোট না দিতে দেওয়া হয়, কিংবা রাষ্ট্রীয় অধিকার হত্যায় ভোটার তালিকায় নাম না ওঠে। এই দুই ক্ষেত্রেই এবার তৃতীয় পক্ষের মানুষ সংগঠিত হয়ে লড়াই করার ক্ষেত্র প্রস্তুত রেখেছেন। ফলে রাজ্য বা কেন্দ্রের শাসকের পক্ষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভোট লুট করা এবার সহজ হবে না।
একটি বড় আলোচনা উঠে আসছে যেখানে তৃণমূল আদতে কোনও মতাদর্শভিত্তিক দল না হয়েও একটা বাম-বাম ভাব দেখিয়ে নিজেদের একটি অবস্থান নির্দিষ্ট করার ফন্দি করে এবং এবারও তা আঁটছে। এই পথের উদাহরণ হিসাবে আসবে বিভিন্ন ভাতার কথা। মাথায় রাখতে হবে যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ভূমিসংস্কার এবং পরবর্তীকালে যে বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প চৌত্রিশ বছরে এসেছে— তার মূল ভিত্তি বামপন্থী মতাদর্শ। অবশ্যই এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে কিছু ভুলত্রুটি জমা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে তৃণমূল সরকারের সার্বিক দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়ন সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তাদের একমাত্র ইতিবাচক কাজ হিসাবে যে ভাতাগুলি দেওয়া হচ্ছে— সব যোগ করে একটি পরিবারের জন্যে তা মাসে অল্প কয়েক হাজার টাকার বেশি নয়। কিন্তু শুধু রাজ্য বাজেটের অঙ্ক (চার লক্ষ কোটি টাকা) ঠিকভাবে কষলে দেখা যায় প্রতি পরিবারের জন্যে গড়ে ধরা থাকে বছরে অন্তত এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা, অর্থাৎ মাসে তেরো হাজারের বেশি। এর সঙ্গে আছে কেন্দ্রের একাধিক প্রকল্প। এই টাকা কি হাতে আসে? নিশ্চয় সরকারকে মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া ছাড়াও অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু আর্থিক অনিয়মের চোটে তৃণমূল রাজত্বে রাজ্যের ঋণ আকাশছোঁয়া (কেন্দ্রের বিজেপিও একই অবস্থায়)। অন্যদিকে আমাদের দেশের বিপুল সম্পদের কথা ভাবলে এটা পরিষ্কার যে প্রতি পরিবারের হাতে নির্দিষ্ট কাজের বিনিময়ে মাসে দশ হাজার টাকাও পৌঁছে দেওয়া আদৌ অসম্ভব নয়। সঙ্গে কাজের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি, কারণ শুধু ভাতার মাধ্যমে একটা গোটা দেশের অর্থনীতি দীর্ঘসময় চালু থাকতে পারে না। সেই কারণেই ২০০৪ সালে, যখন কেন্দ্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলেন বামপন্থী সাংসদেরা (সংখ্যায় ষাটের বেশি), তখনই এসেছিল একশো দিনের কাজের প্রকল্প। গোটা ভারতে এবং এই রাজ্যে বারবার বামপন্থীরা বলেছেন কাজের দিন বাড়ানোর কথা— অন্তত দুশো দিন করা। সঠিক কাজের বিনিময়ে মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার যে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা— সেই পথে আবার যাত্রা শুরু হতে পারে বামপন্থীরা ২০২৬-এ এই রাজ্যে ক্ষমতায় এলে।
রাজনীতির ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে— যে মুহূর্তে ভোটার “অসম্ভব” শব্দটি বাদ দেন, সেই মুহূর্তেই ফলাফল বদলাতে শুরু করে। এটা নির্ভর করছে আলোচনার শুরুতে উল্লেখ করা সেই দোদুল্যমান বড় অংশের ভোটের ওপর। যদি তারা ঘুরে দাঁড়ায়, সেক্ষেত্রে সমীকরণ বদলে গিয়ে বামপন্থীদের এগিয়ে থাকাটা অসম্ভব থাকছে না। “নেতিবাচক কম ক্ষতিকর” - এই যুক্তি সরে গিয়ে “ইতিবাচক বাস্তব বিকল্পের" রাজনীতি সামনে আসবে। সেই জায়গাতেই সিপিআই(এম)’র নেতৃত্বে বামফ্রন্ট তার সহযোগী শক্তিগুলিকে নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে। এই নির্বাচন তাই শুধু সরকার গঠনের নয়— ভোটের চরিত্র বদলের নির্বাচন। এখানে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটার— তিনি কি আবারও বাধ্য হয়ে বিরক্তি সহকারে ভোট দেবেন, না কি নিজের পছন্দকে জিতিয়ে আনবেন? অঙ্কটি খুব কঠিন নয়। একজন দুইফুল-বিরোধী সচেতন মানুষ তাঁর কাছের দু’-তিনজন ‘‘একফুল বিরোধী কিন্তু বাধ্য হয়ে বেজার মুখে অন্য ফুলকে ভোট দেওয়া’’ ভোটারের কাছে পৌঁছে গেলেই এই সরল এবং বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব। সেই যুক্তিতেই সিপিআই(এম) এবার শক্তিশালী লড়াইতে আছে। সেখানে অবশ্যই প্রতিযোগিতা কঠিন, কিন্তু আদৌ অসম্ভব নয়।
Comments :0