দিল্লিতে বিরোধী দলের নেতা ও আন্দোলনকারীদের আটক এবং বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। আটক ব্যক্তিদের রবিবারের মধ্যে মুক্তি দেওয়া না হলে ফের অনশন অথবা পদযাত্রা শুরু করার কথা বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি। সেই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে সামিল হওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছিল সিপিআই(এম)’এর পক্ষ থেকে। শনিবার দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর কার্যত কারফিউ জারি করে এই বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ, মেট্রো স্টেশন বন্ধ, সমস্ত পরিবহন ব্যবস্থা স্তব্ধ করে দেওয়া সহ সমস্ত ধরনের দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ, আধা সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন।
দিল্লি পুলিশ আটক করেছে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে-কে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে কেরালার প্রাক্তন মুখ্য মন্ত্রী এবং সিপিআইএম পলিত ব্যুরো সদস্য পিনারা ই বিজয়নকে। আটক করা হয়েছে প্রবীণ মহিলা নেত্রী বৃন্দ কারাত, কে কে শৈলজাকেও। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ৩ হাজারের বেশি প্রতিবাদীকে আটক করেছে। প্রশাসনের দাবি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অভিজিতের মা অনিতা দীপকে পুলিশের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তাঁর ছেলে ও অন্যদের বিমানের ভেতরে আটক করা হয়েছিল। তিনি জানতে চেয়েছেন, যে ছাত্ররা প্রতিবাদ করতে দিল্লিতে এসেছিল, তারা কি চম্বলের ডাকাত ছিল। বাবা ভগবান দীপক বলেছেন, প্রতিবাদ করার আইনি অধিকার প্রত্যেক ভারতীয়ের আছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার গণতন্ত্রকে সম্মান করছে না। তিনি বলেন তিনি তাঁর ছেলের পাশে দৃঢ়ভাবে আছেন এবং তাঁর কাছে অভিজিৎ চন্দ্রশেখর আজাদ ও ভগত সিংয়ের মতো।
এদিন সামাজিক মাধ্যমে ওয়াংচুক জানান, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের আটকের খবর তিনি পেয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি দাবি করেন আটক ব্যক্তিদের আগামীকালের মধ্যে মুক্তি দেওয়া না হলে তাঁকে অনশন কিংবা পদযাত্রার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
এদিন শিবসেনার আদিত্য ঠাকরে দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের আটক করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়া লিখেছেন যে, বর্তমান সরকারের এই পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থা বলার সাহসও নেই।
সিজেপি’র বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে, আটককৃত সকলের পরিচয় বা তারা মুক্তি পেয়েছেন কিনা, তা জানা যায়নি।
দিল্লিতে কেরালা ভবনের বাইরে বিক্ষোভের জেরে কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং সিপিআই(এম) সাংসদ জন ব্রিটাসকে পুলিশ আটক করেছে। জন ব্রিটাসের অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা না জানিয়েই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল। ব্রিটাস জানান, কেরালা বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও সিপিআই(এম)’র প্রবীণ নেতা কে.এন. বালাগোপাল এবং তাঁকে একটি পুলিশ জিপে করে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর পর পুলিশ ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যায়। প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর তাঁদের আবার পুলিশ জিপে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিটাসের মতে, পুলিশ তাঁদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল তা তিনি জানতেন না।
কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি অভিযোগ করেন যে ২৫৪ জন সাংসদকে হেনস্থা করা হয়েছে এবং অবৈধভাবে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলোর অন্যান্য বিক্ষোভকারীদের সাথেও একই রকম আচরণ করা হয়েছে। রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে রাজধানী চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। ট্রেন ও মেট্রো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং বিভিন্ন স্থানে চেকপয়েন্ট বসানো হয়েছিল। নিজেদের সাংবিধানিক অধিকারে প্রতিবাদকারী তরুণ-তরুণীদের মারধর ও আটক করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে সরকার জবাবদিহিতার ভয়ে ভীত। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্র চালানোর অভিযোগ করেছেন। তিনি আরও বলেন, যারা গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে সহযোগিতা করে, তারা দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
সিজেপি-র বিক্ষোভের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ থেকে আটক করা হয়। দলের প্রবীণ নেতা ডেরেক ও'ব্রায়েন, দোলা সেন এবং অন্যান্য নেতাদেরও আটক করা হয়। দলের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ মমতা ব্যানার্জীর আটকের একটি ভিডিও শেয়ার করে দিল্লি পুলিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দলটি পোস্টে লিখেছে, ‘‘মোদী-শাহ জুটি হয়তো তাদের সীমা লঙ্ঘন করতেই থাকবে, কিন্তু কোনো সরকারই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়, আর কারও ক্ষমতাও চিরস্থায়ী হয় না। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি অন্ধকার দিন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই কখনও থামানো উচিত নয়।’’
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিতে দিল্লিগামী মানুষের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে। সরকারের এই পদক্ষেপকে কাপুরুষোচিত আখ্যা দিয়ে তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ব্যাপক নির্বাচনী সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুলে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ না করে সরকারের উচিত ছিল তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। তিনি বলেন, "আমি এই পদক্ষেপের নিন্দা জানাই কারণ এটি একটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ছিল। এই মানুষগুলো দিল্লিতে বিক্ষোভে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন।" আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা একটা কঠোর কথা, কিন্তু যেকোনো সরকারের পক্ষে এমন কাজ করাটা কাপুরুষোচিত।
আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, এটি জরুরি অবস্থার চেয়েও খারাপ। এখন এটা স্পষ্ট যে আমরা মোদীর শাসনে সম্পূর্ণ একনায়কতন্ত্রের যুগে বাস করছি। তিনি বলেন, সরাসরি ফ্লাইট থেকে সিজেপি নেতাদের গ্রেপ্তার করা সরকারের নজিরবিহীন ভয়কেই প্রকাশ করে। কেজরিওয়াল বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদী পরিষ্কার জানেন যে তিনি ভোট চুরি করে নির্বাচনে জিতেছেন। এখন তিনি গণতন্ত্রকে পুরোপুরি পদদলিত করে তার করা জালিয়াতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ করা উচিত, কিন্তু মোদীরও চলে যাওয়া উচিত।”
Sonam Wangchuk
আন্দোলনকারীদের মুক্তি না দিলে ফের অনশন- পদযাত্রা, হুঁশিয়ারি সোনম ওয়াংচুকের
×
Comments :0