ডাঃ ফুয়াদ হালিম।
নিপা ভাইরাস (NiV) একটি আবরণযুক্ত নেগেটিভ-স্ট্র্যান্ড RNA প্যারামাইক্সোভাইরাস (জেনারেশন: Henipavirus; ফ্যামিলি: Paramyxoviridae)। এটি প্রথম দেখা যায় ১৯৯৮–১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে, যেখানে এটি মানুষ ও শূকরের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে। সেখানে ২৫০ জনের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ১০০ জনেরও বেশি মারা যায়। পরবর্তীতে ২০০১–২০০৪ সালে বাংলাদেশে এবং ২০০১ সালে ভারতের প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এর প্রাদুর্ভাব ঘটে। সাধারণত প্রতিবার কয়েক ডজন মানুষ এতে আক্রান্ত হয়।
নিপা ভাইরাস হেন্দ্রা ভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ঘোড়া ও তাদের পরিচর্যাকারীদের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করেছিল এবং পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে, ২০১৮ সালে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের কেরালা রাজ্যে নিপাহ ভাইরাস একটি বড় প্রাদুর্ভাব ঘটায়।
মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ/ভারতের প্রাদুর্ভাব থেকে প্রাপ্ত ভাইরাল জিনোমের সিকোয়েন্স বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে নিপাহ ভাইরাস দুটি স্বতন্ত্র লিনিয়েজ বা জিনোটাইপে বিভক্ত: নিপাহ–মালয়েশিয়া (NiV-M) এবং নিপাহ–বাংলাদেশ (NiV-B)। এই দুই ভাইরাল লিনিয়েজের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। NiV-M সংক্রমণের ক্ষেত্রে শূকর মধ্যবর্তী বাহক হিসেবে কাজ করেছিল, কিন্তু NiV-B-এর ক্ষেত্রে এখনো কোনো মধ্যবর্তী বাহক চিহ্নিত করা যায়নি।
NiV-M-এর বিপরীতে, NiV-B সংক্রমণের প্রধান উৎস হলো কাঁচা খেজুরের রস পান করা ও ফল খাওয়া, যা বাদুড় দ্বারা সংক্রমিত হয়। NiV-M -র ক্ষেত্রে মানুষে-মানুষে সংক্রমণ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়নি, কিন্তু NiV-B-এর ক্ষেত্রে একাধিকবার এটি সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া NiV-B প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুহার অনেক বেশি (৬০–১০০%), যেখানে NiV-M-এর ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩৯%।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—NiV-M সংক্রমণে যেখানে মূলত এনসেফালাইটিস দেখা যায়, সেখানে NiV-B সংক্রমণে তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গও প্রায়ই দেখা যায়।
নিপা ভাইরাসের প্রাকৃতিক রিজার্ভয়ার হলো ‘ফ্লাইং ফক্স’ ফলবাদুড় (গণ: Pteropus)। এদের মধ্যে ভাইরাসের সরাসরি উপস্থিতি ও সেরোলজিকাল প্রমাণ উভয়ই পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে চীন (ইউনান ও হাইনান দ্বীপ), কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, মাদাগাস্কার এবং পশ্চিম আফ্রিকার ঘানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ১০টি গণের অন্তর্ভুক্ত ২৩ প্রজাতির বাদুড়ের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের সেরোলজিকাল প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই ভাইরাস বাদুড়ের মূত্রের মাধ্যমে নির্গত হয়। মালয়েশিয়ার প্রাথমিক প্রাদুর্ভাবে শূকর সম্ভবত বাদুড় দ্বারা দূষিত ফল খাওয়ার মাধ্যমে বা সরাসরি বাদুড়ের মূত্রের সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়। শূকরের মূত্র, লালা ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণে ভাইরাস নির্গত হয়, যার মাধ্যমে প্রধানত শূকর পালনকারী, তাদের পরিবার এবং কিলখানার কর্মীরা সংক্রমিত হন। বাদুড়ের লালা বা মল দ্বারা দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান করাও সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এছাড়া বাংলাদেশে মানুষে-মানুষে সংক্রমণের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
রোগসৃষ্টির প্রক্রিয়া ও রোগতত্ত্ব (Pathogenesis and Pathology)
মানুষ নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হয় সংক্রমিত শূকর বা মানুষের নিঃসরিত শ্বাসের মাধ্যমে, বাদুড়ের বর্জ্যের সংস্পর্শে এলে, অথবা দূষিত খেজুরের রস পান করার মাধ্যমে। এই রোগে মস্তিষ্কের প্যারেনকাইমায় এন্ডোথেলিয়ামের ক্ষতি ও ভাসকুলাইটিস দেখা যায়। এছাড়া নিউক্লিয়ার ইনক্লুশন লক্ষ্য করা যায়, যা হাম (measles)-এর মতো অন্যান্য প্যারামাইক্সোভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভাসকুলাইটিস-জনিত থ্রম্বোসিসের ফলে ব্যাপক মাইক্রোইনফার্ক্ট দেখা যায়। পাশাপাশি ভাইরাস সরাসরি স্নায়ুকোষে অনুপ্রবেশ করে।
রোগ লক্ষণ (Clinical Features)
মানুষের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে প্রধানত এনসেফালাইটিস হয়, যার লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে অজ্ঞান ভাব, খিঁচুনি, নেতিয়ে পড়া ও হাইপোটোনিয়া। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নিউমোনিয়া দেখা যায় এবং বুকের এক্স-রেতে বিস্তৃত ইন্টারস্টিশিয়াল ইনফিলট্রেট লক্ষ্য করা যায়।
ইনকিউবেশন পিরিয়ড সাধারণত ৭ থেকে ৪০ দিন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীর মেনিনজিয়াল লক্ষণ থাকে এবং প্রায় ২০% রোগীর সাধারণ খিঁচুনি হয়। ডায়াফ্রাম, বাহু ও ঘাড়ে পেশির অস্বাভাবিক সংকোচন সাধারণত দেখা যায়। এছাড়া সেরিবেলার ডিসফাংশন, কাঁপুনি, ও অ্যারিফ্লেক্সিয়া হতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে ব্রেনস্টেম আক্রান্ত হয়, যার লক্ষণ হিসেবে পিনপয়েন্ট ও আলোতে সাড়া না দেওয়া পিউপিল, অস্বাভাবিক অকুলোসেফালিক রিফ্লেক্স, ট্যাকিকার্ডিয়া ও হাইপারটেনশন দেখা যায়।
কয়েকটি রিপোর্টে দেখা গেছে যে, যেসব রোগীর প্রাথমিক সংক্রমণ মৃদু বা উপসর্গহীন ছিল, তারাও কয়েক মাস পরে এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। ক্লিনিক্যাল ও ইমিউনোলজিক দিক থেকে এই অবস্থা হাম ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট SSPE-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। মালয়েশিয়ায় মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৩৫%, কিন্তু বাংলাদেশে তা ৭০%-এরও বেশি।
রোগ নির্ণয় (Diagnosis)
রোগীর ক্ষেত্রে হালকা থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া এবং লিভার ফাংশন টেস্টের মান বৃদ্ধি পেতে পারে। CSF-এ সাধারণত লিম্ফোসাইট প্রাধান্যসহ প্লিওসাইটোসিস দেখা যায়।
নিপাহ ভাইরাস নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত পরীক্ষাগুলির মধ্যে রয়েছে নিউক্লিক অ্যাসিড অ্যামপ্লিফিকেশন টেস্ট (যেমন PCR ও সিকোয়েন্সিং), IgG/IgM/অ্যান্টিজেন ELISA, ইমিউনোফ্লুরোসেন্স অ্যাসে, হিস্টোপ্যাথোলজি, ভাইরাস আইসোলেশন ও নিউট্রালাইজেশন। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করা উচিত—যেমন গলা ও নাকের সোয়াব, CSF, মূত্র ও রক্ত।
সক্রিয় সংক্রমণ নির্ণয়ে PCR সবচেয়ে সংবেদনশীল পদ্ধতি। যেখানে PCR সুবিধা নেই, সেখানে NiV-নির্দিষ্ট IgM ELISA একটি বিকল্প পদ্ধতি। মৃত্যুর পর নিশ্চিতকরণের জন্য ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি-সহ হিস্টোপ্যাথোলজি ব্যবহৃত হয়। ভাইরাস আইসোলেশন ও নিউট্রালাইজেশন সাধারণত BSL-4 ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ। MRI-তে সাধারণত সাব-কর্টিকাল ও গভীর সাদা পদার্থে ছোট ক্ষত এবং আশপাশে ইডিমা দেখা যায়।
ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা (Management and Treatment)
নিপাহ ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা টিকা নেই, যদিও কিছু ক্ষেত্রে রিবাভিরিন ব্যবহার করা হয়েছে। হাসপাতাল ভিত্তিক সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকায়, বিশেষ করে রোগী ভেন্টিলেশনে থাকলে, কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
প্রতিরোধ (Prevention)
নিপা ভাইরাসের কোনো টিকা নেই। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো শূকরের সংক্রমণ প্রতিরোধ, সংক্রমিত প্রাণী থেকে মানুষের সংক্রমণ রোধ এবং মানুষে-মানুষে সংক্রমণ বন্ধ করা। ‘ওয়ান-হেলথ’ পদ্ধতির অংশ হিসেবে শূকর খামারের নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুনাশ ও প্রাণী নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
চাষিদের ‘বার্কিং পিগ’ বা শ্বাসকষ্টযুক্ত শূকরের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শূকরের মধ্যে প্রাদুর্ভাব সন্দেহ হলে সেগুলিকে হত্যা করে নিরাপদভাবে দেহাবশেষ অপসারণ করতে হবে। অসুস্থ প্রাণী পরিচর্যার সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা আবশ্যক।
মানুষকে ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি—বিশেষ করে সদ্য সংগ্রহ করা খেজুরের রস ফুটিয়ে পান করা এবং ফল ভালোভাবে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা। সন্দেহভাজন নিপাহ রোগীর পরিচর্যার সময় গ্লাভস ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।
ভারতে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে মানুষে-মানুষে সংক্রমণের হার খুব বেশি ছিল, যা বাংলাদেশের প্রাদুর্ভাবগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। রোগীকে আলাদা রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
Comments :0