Editorial

মেলোডি পর্ব

সম্পাদকীয় বিভাগ


দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ অর্থাৎ শ্রমিক, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, যুব ও মহিলাদের জন্য ঠিক কতটা তিনি ভাবেন সেটা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ থাকলেও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কথা তিনি যথেষ্ট পরিমাণে ভাবেন বা ভেবেছেন সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তা না হলে মেলোনির জন্য যাবার আগে ভারত থেকে ‘মেলোডি’ নামে চকলেটের প্যাকেট সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন না। নিঃসন্দেহ অনেক ভেবেচিন্তে মেলোডি নামক চকলেটের ব্রান্ডটি পছন্দ করেছেন এবং সংগ্রহ করেছেন। মেলোডি নামটির মধ্যে কিন্তু অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রীর নাম জর্জিয়া মেলোডি। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম নরেন্দ্র দামোদর মোদী। মেলোনি আর মোদীর সংমিশ্রণে তৈরি হয় মেলোডি। কী আশ্চর্য সমাপতন।
প্রথমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তারপর গাজায় ইজরায়েলী গণহত্যা অভিযান করোনা বিপর্যয়েত্ত বিশ্বে গত প্রায় চার বছরেরও বেশি সময় ধরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করলেও এবং ভূরাজনৈতিক সঙ্কটজনিত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেও তেমন বড়সড় সঙ্কটের মুখে ভারতকে পড়তে না হলেও মারাতাত্মক আঘাত এসেছে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের পর। ভারতের জ্বালানি জোগানে প্রধান উৎসব পশ্চিম এশিয়া এই যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তা ছাড়া ভারতের তেল-গ্যাস আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে যে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে সেই সঙ্কীর্ণ সমুদ্র পথ বন্ধ হবার ফলে ভয়াবহ জোগান সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে পরিবর্তন ব্যয়, বিমার ব্যয় ধরে অস্বাভাবিক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। এমনিতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ৫১ শতাংশ বেড়ে গেছে। তারপর একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ৮৪ টাকা থেকে ৯৭ টাকায় পৌঁছে গেছে।
পরিস্থিতি ক্রমাগত ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতর হয়ে উঠছে দেখে অর্থম ন্ত্রী নির্মলা সীতারামন মৌনব্রত নিয়েছেন। আগে তাঁকে প্রতিদিনই প্রায় দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে জ্ঞান বিতরণ করতে দেখা যেত। এখন তিনি কার্যত নিখোঁজ। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সবটাই মোদীরা জানেন। জেনে বুঝেই নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে চেপে গেছেন। বদলে চুটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে মোদী গ্যারান্টি বিলিয়েছেন। দেশের অর্থনীতি ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের দ্রুত এগচ্ছে দেখেও দেশের জনগণের কাছে গোপন করেছেন সঙ্কীর্ণ দলীয় রাজনীতির স্বার্থে।
ভোট মিটতেই আসল রূপ ধারণ করে একের পর এক তেল, গ্যাসের দাম বাড়ানো শুরু হয়ে যায়। রান্নার গ্যাসের বাণিজ্যিক ব্যবহারে কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। বিমানের জ্বালানি, সিএনজি, অটোর গ্যাস, পেট্রল, ডিজেল ইত্যাদির দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়। একাধিক জনসভায় ভাষণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে দেশের স্বার্থে সংযমী হতে ও সৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দেন। বুঝিয়ে দেন দেশ বিদেশি মুদ্রার সঙ্কটে ডুবছে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে সেই ১৯৯১ সালের বিওপি সঙ্কটের। তাই দেশবাসীকে সোনা কেনা বন্ধ করতে, বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করতে, জ্বালানি খরচ কমাতে, কম তেলে রান্না করতে পরামর্শ দেন। জনগণকে উপদেশ দিয়েই তিনি মহাসমারোহে বেরিয়ে পড়েন প্রায় সপ্তাহব্যাপী পাঁচ দেশ ভ্রমণে। দেশের স্বার্থে জনগণকে আত্মত্যাগের কথা বলে নিজে বি‍‌দেশে সময় কাটাচ্ছেন ফুরফুরে মেজাজে হাসিখুশিতে। ৪ হাজার কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রায় কেনা অত্যাধুনিক বিলাসী বিমানে করে বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়েছেন আনুমানিক ৮০ কোটি টাকা বিদেশি মুদ্রা খরচ করে। কোনও দেশেই তাঁর এই ভ্রমণ জরুরি ছিল না। ছ’মাস-একবছর পরে গেলেও চলত। দে‍‌শের অর্থনীতি যখন ঘোর সঙ্কটে, দাম বাড়ছে হু হু করে, অজানা আশঙ্কায় মানুষের ঘুম ছুটে যাচ্ছে তখন প্রধানমন্ত্রীর এভাবে বিপুল বিদেশি মুদ্রা খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ নিতান্তই বেমানান। আর ইতালি ভ্রমণ তো ইতিমধ্যে আমজনতার চোখে দৃষ্টিকটু রূপে সমালোচিত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে এটা কি মেলোনিকে মেলোডি উপহার দেবার সময়? মেলোনির সঙ্গে এক গাড়িতে রোম শহর ঘুরে বেড়ানোর সময়?

Comments :0

Login to leave a comment