Editorial

ধর্মান্ধতার নির্বুদ্ধিতা

সম্পাদকীয় বিভাগ

আরএসএস’র হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের মতাদর্শে পরিচালিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে। তৃণমূলের সর্বগ্রাসী অত্যাচার এবং দমবন্ধ করা আতঙ্কের পরিবেশ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মানুষ ঢেলে ভোট দিয়েছেন বিজেপি-কে। ফলে প্রত্যাশার থেকে অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। এই অভাবনীয় জয়ের আনন্দে সরকার গঠনের পর থেকে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে একের পর এক সরকারি পদক্ষেপ ঘোষণা করা হচ্ছে এবং বিজ্ঞপ্তি জারি হচ্ছে। বিজেপি’র রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি যেহেতু ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন তাই এই সরকারি ঘোষণা ও বিজ্ঞপ্তির মধ্যেও প্রাধান্য পাচ্ছে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর উপাদান। অর্থাৎ ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক জিগির জারি রেখে উত্তেজনার আড়ালে চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষের রুটি রুজির প্রশ্ন। নির্বাচনে প্রবলভাবে উঠে এলেও ক্ষমতা দখলের পর সেগুলিকে চাপা দে‍‌বার এবং যথাসম্ভব ভুলিয়ে দেবার পরিকল্পিত প্রয়াস চলছে। ক্ষমতায় এসেই সরকারের অগ্রাধিকারের এসে গেছে হকার উচ্ছেদ, বেআইনি বাড়ি ভাঙা, পশু হত্যা নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করা ইত্যাদি। আর এই অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলিতে টার্গেট করা হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষকে। নিউ মার্কেটে বুলডোজার দিয়ে হকার উচ্ছেদ অভিযানে প্রধানত টার্গেট সংখ্যালঘুরা। তেমনি অবৈধ বাড়ি ভাঙার জন্য তপসিয়ায় বুলডোজার ব্যবহার হয় । রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ হকার বেঁচে আছে হকারি করে। বিকল্প রোজগারের অভাবেই হকার বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এখানে হিন্দু হকার ও মুসলিম হকার বলে আলাদা কিছু নেই। পেটের দায়ে সকলেই হকার। সরকার হকার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে আদতে অগণিত মানুষের রুজির শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিচ্ছে। যেখানে নির্বাচনে মোদী গ্যারান্টি ছিল কাজ দেওয়া। ক্ষমতায় এসে তারা কাজ কেড়ে নেবার অভিযান শুরু করেছে।
সামনে মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ। সুযোগ বুঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ইন্ধন জোগাতে তড়িঘড়ি পশুহত্যা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। ১৫ বছর বয়স না হলে এবং পশু চিকিৎসকের শংসাপত্র না থাকলে কোনও গোরু হত্যা করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারা বিজেপি’র ঝান্ডা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে পশুপালক, পশু ক্রেতা-বিক্রেতা, পশু পরিবহণকারীদের উপর জুলুম শুরু করে দিয়েছে। ফলে গোটা রাজ্যে সর্বত্র পশু হাটগুলি রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় পশু নিয়ে কেউ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছেন না। ঈদের আগে পশু হাটগুলিতে ব্যাপক কেনাকাটা হয়। গ্রামবাংলার গোপালকরা তাদের দুধ দেওয়া বন্ধ করা গোরুও নানা কারণে কাজে লাগে না এমন গোরুগুলো হাটে বিক্রি করে দেন। এবার সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সমূহ আর্থিক সঙ্কটের মুখে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির পাশাপাশি পশুপালন একটি অন্যতম রোজগারের পথ। অসংখ্য পরিবারের পশু পালনই একমাত্র রোজগার । সেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই, সবারই রুজির পথ। বেশিরভাগই বিপুল টাকা ঋণ নিয়ে পশু পালন করেন। বছর বছর এই সময় অলাভজনক পশুগুলি বিক্রি করে ঋণ শোধ করেন। এবার নতুন সরকার তাদের সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। বেচতে না পারলে যেমন টাকার সংস্থান হবে না তেমনি সেই পশুগুলিকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে হবে টাকা খরচ  করে। এটা একরকম অসম্ভব ব্যাপার। নতুন সরকারি ফতোয়ায় চাপড়ার জোগানে টান পড়বে। সঙ্কট বাড়বে চর্ম শিল্প ও তার শ্রমিকদের। তেমনি এর ফলে পশু পালনে উৎসাহ কমে যাওয়ায় দুগ্ধ উৎপাদন মার খাবে। দুধের দাম অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। গ্রাম বাংলার অর্থনীতির মারাত্মক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিয়েছে শুভেন্দুর হিন্দুত্ববাদী সরকার।
 

Comments :0

Login to leave a comment