ইজরাইলি হেফাজতে থাকা প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতন ও হিংসার গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেছে স্বাধীন ইজরায়েলি তদন্তের রিপোর্টে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামলার পর থেকে হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গুরুতর অভিযোগের সম্মুখীন। একটি স্বাধীন ইজরায়েলি তদন্তের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, হামাস হামলা চলাকালীন এবং তার পরেও বন্দি করা ব্যক্তিদের ওপর পরিকল্পিতভাবে যৌন হিংসা চালিয়েছে। প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী, পুরুষ এবং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ দিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে ফেলার জন্য যৌন হয়রানি এবং অপমানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুসারে, গাজা সীমান্তের কাছে এবং বেশ কয়েকটি ইজরায়েলি বসতিতে অনুষ্ঠিত নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যালে নৃশংসতা ঘটেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন , হামলাকারীরা প্রকাশ্যে নারীদের অপমান করেছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে হত্যার পরেও মৃতদেহগুলোর ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল। বেঁচে যাওয়া রাজ কোহেন বলেছেন, তিনি এক নারীকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে আক্রমণ করতে দেখেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাশবিক ঘটনায় ৩৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেককে বন্দি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তদন্তে অন্তর্ভুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণে বলা হয়েছে, কিছু বন্দিকে তাদের আত্মীয়দের ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে এটিকে পরিবারগুলোকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিছু ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক বিয়ের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাক্তন বন্দি আগাম গোল্ডস্টেইন বলেছেন, বন্দিদশার সময় নিজেদের শরীর ও ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ই ছিল সবচেয়ে বিধ্বংসী অভিজ্ঞতা। তদন্তকারীদের মতে, অনেক বন্দিকে মাসের পর মাস সুড়ঙ্গ এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থলে আটকে রাখা হয়। তদন্তকারীরা এই অপরাধগুলোকে ‘কাইনোসাইডাল সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি এমন এক ধরনের যৌন হিংসা যা পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক বিপর্যয় ঘটাতে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নারী ও শিশুদের ওপর জীবিত এবং মৃত—উভয় অবস্থায় যৌন নিগ্রহ চালানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের পর ভুক্তভোগীদের হত্যা করা হয়েছে এবং মৃতদেহগুলোকে ‘ট্রফি’ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিকোলাস ক্রিস্টফ তাঁর একটি কলামে তিনি ইজরায়েলি কারাগারগুলোতে প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের ওপর ব্যাপক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। ঘটনার বিবরণে সাংবাদিক লিখেছেন, ‘‘একবার ওই সাংবাদিককে ‘জোর করে মাটিতে চেপে ধরা হয় এবং বিবস্ত্র করা হয়। এরপর তাঁর চোখে পট্টি বেঁধে ও হাতে হাতকড়া পরিয়ে একটি কুকুরকে সেখানে ডেকে আনা হয়। সাংবাদিকের মতে, একজন প্রশিক্ষক কুকুরকে নির্দেশ দিয়ে উৎসাহিত করার পর, কুকুরটি তাঁর ওপর চড়ে বসে।’’ এই ধরনের অভিযোগ শুধু এক সাংবাদিক নন। আল জাজিরা ও বিবিসির মতো কিছু সংবাদমাধ্যমও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন ভুক্তভোগীদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যাঁরা দাবি করেছেন, ইজরায়েলি আটক কেন্দ্রগুলোতে কুকুরের মাধ্যমে ধর্ষণ বা নির্যাতনের ঘটনা তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন কিংবা নিজেরাই এমন অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই ধরনের অপকর্ম সেখানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা পদ্ধতিগত চর্চায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্যালেস্তিনীয় বন্দীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে ইজরায়েলি বাহিনী প্রাণীদের—বিশেষ করে প্রশিক্ষিত কুকুরদের—ব্যবহার করে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছে।
তদন্ত কমিশনের প্রধান ড. কোচাভ এলকায়াম লেভি বলেছেন, প্রাপ্ত প্রমাণ থেকে দেখা যায়, যৌন হিংসা একটি পরিকল্পিত কৌশল ছিল। প্রতিবেদনটিতে ৪৩০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার, হাজার হাজার ছবি এবং ভিডিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কমিশন এই ঘটনাগুলোকে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, যদিও হামাস এর আগে এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে। বেশ কয়েকটি দেশ প্রতিবেদনে করা অভিযোগগুলোর একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে, যা গাজা সংঘাত এবং বন্দিদের নিরাপত্তা নিয়ে একটি বিশ্বব্যাপী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তদন্তকারীরা এই কর্মকাণ্ডগুলোকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার শামিল বলে অভিহিত করেছেন। গভীর মানবিক বন্ধনগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ট্রমা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই ভয়াবহ অপরাধের মূল উদ্দেশ্য।
Palestinian Prisoners
প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফাঁস
ফাইল ছবি
×
Comments :0