PROBANDHA | AMADER RABINDRANATH | DEBASHIS ACHARJEE | MUKTADHARA | 4th YEAR | 14 MAY 2026 | KABIPAKSHA

প্রবন্ধ | আমাদের রবীন্দ্রনাথ | দেবাশিস আচার্য | মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ১৪ মে ২০২৬ | কবিপক্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

PROBANDHA  AMADER RABINDRANATH  DEBASHIS ACHARJEE  MUKTADHARA  4th YEAR  14 MAY 2026  KABIPAKSHA

প্রবন্ধ | আমাদের রবীন্দ্রনাথ

        দেবাশিস আচার্য

মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ১৪ মে ২০২৬ | কবিপক্ষ

 

যত বড় হয়েছি (বয়সে) রবীন্দ্রনাথ ততই নানা শাখা প্রশাখা বিস্তার করে  আমাকে ছায়া দিয়েছেন। আমার বই এর অগোছালো দেরাজের টপ ফ্লোরে দুই দাড়িওয়ালার মাটির আবক্ষ মূর্তি ঠাঁয় করে নিয়েছে। একটা এস এফ আই থেকে বিদায় সম্বর্ধনার সাথে রবীন্দ্রনাথ আর অন্যটি পার্টির সম্মেলনে পাওয়া মার্কস। সহজপাঠের রবীন্দ্রনাথ আমার ছেলে বেলায় আমার মনের মধ্যে যে রূপকল্পের ক্যানভাস টাঙিয়ে দিয়েছিলেন,তা আমি হাজার চেষ্টা করেও মুছতে পারি নি আজও। ছোট্ট বেলায় রবীন্দ্রনাথকে ঠাকুর বানিয়ে ফটোতে মালা চন্দন সাজিয়ে পঁচিশে বৈশাখের সকাল সন্ধ্যায় কত কবিতা আবৃত্তি করেছি, কবির জীবনী মুখস্থ বলেছি। নিজের হাতে মালা গেঁথে পড়িয়েছি কতবার। তারপর বড় হয়ে যখন রবীন্দ্রনাথকে আরও জানার অক্ষম চেষ্টা করছি তত বুঝেছি, এতো দিন তো তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থেকেছি।

একজন কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে এ খোটা কতবার শুনেছি, এক কমিউনিস্ট নেতা ছদ্মনামে রবীন্দ্রনাথকে "বুর্জোয়া কবি"বলে গালি দিয়েছেন।আর এর সব দোষ গিয়ে পড়েছে গোটা কমিউনিস্ট পার্টির উপর। সেই অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ার মতোই "যেখানে যা কিছু ঘটে অনিষ্টি/...মূলে কমুনিষ্টি"
অথচ রবীন্দ্রনাথের প্রতি কমিউনিস্টদের শ্রদ্ধা আর সম্পর্কের সেতু নির্মাণ কথা বেমালুম আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।

ছদ্মনামে কমিউনিস্ট নেতার রবীন্দ্র নিন্দার পরে পার্টির পক্ষ থেকে এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করা হয়। কমিউনিষ্ট হীরেন্দ্র মুখোপাধ্যায় এর তীব্র প্রকাশ্য নিন্দা করে বলেছেন "প্রথম থেকেই এদেশের মার্কসবাদ রবীন্দ্র সৃষ্টি থেকে প্রভূত নৈতিক উদ্দীপনার সন্ধান পেয়েছে।কবির কিশোরকালের রচনা থেকে শুরু করে অজস্র রত্নের দ্যুতি থেকে তাদের বহুবিঘ্নিত পন্থা আলোর খোঁজ পেয়েছে।"
এ বাঙালার কমিউনিস্টরাই ১৯৬১সালে রবীন্দ্র শতবর্ষে প্রথম পার্ক সার্কাস মাঠে রবীন্দ্র মেলার আয়োজন করে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
ছদ্মনামে এক কমিউনিস্ট নেতার ব্যক্তিগত মতামতকে শুধু পার্টি বা কমিউনিস্ট কবি সাহিত্যিকরা নস্যাৎই করেন নি, তাঁরা রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, দেশপ্রেম, সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদবিরোধিতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে সেই পথে যাত্রা করেছেন। মার্কসবাদে বিশ্বাসী কাস্তের কবি দিনেশ দাস লেখেন,
"তোমার পায়ের পাতা/সবখানে পাতা/কোনখানে রাখবো প্রনাম।"
কমিউনিষ্ট কবি সুকান্ত বলেন,
"এখনো তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি, মত্ততা ছড়ায় যথারীতি"
আসলে সোভিয়েতেও একসময় মহাকবি টলস্টয় সম্পর্কে সেদেশের প্রগতিশীল সাহিত্য সাংস্কৃতির সাথে যুক্ত অনেকেই যেমন বিমূল্যায়ন করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও সেই রূপ ভ্রান্তি ছিল। টলস্টয় ও তাঁর সৃজনশীলতা নিয়ে বলতে গিয়ে লেনিন যথার্থই বলেছিলেন, প্রতিক্রিয়ার শক্তি টলস্টয়কে একটা উঁচু মঞ্চে স্থাপন করে সেই মঞ্চ থেকে তাঁর প্রতিভার যে অংশ অতীতের সামগ্রী, আগামীর সম্পদ নয়, সেই অংশটাকে সামনে নিয়ে আসার কৌশল করেছে।... কিন্তু যেখানে টলস্টয় কৃষকদের যুগযুগান্তের দাসত্ব, রাষ্ট্রীয় শোষন, অত্যাচার, বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র আর চার্চকে এবং জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানাকে কঠোর ও তীব্র মনোভাব নিয়ে আঘাত করেছেন, যেখানে ধনতন্ত্রের বিপদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন , গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সমস্যা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন,সেই সব দিককে এরা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চেয়েছেন।"রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।
রবীন্দ্রনাথের সাথে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক আদর্শগত অবস্থান থেকেই।তাই তো শুধুমাত্র বাঙালি কমিউনিস্ট সদ্য প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বই এর আলমারি নয়, মহামতি লেনিনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে মার্কস এঙ্গেলস টলস্টয় এর রচনাবলীর পাশে রবীন্দ্রনাথ থাকেন সযত্নে।
রবীন্দ্রনাথের জন্মমাসেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের বিজয় দিবস। রবীন্দ্রনাথ এই যুদ্ধে খোলাখুলি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
ইতিপূর্বে তিনি সোভিয়েত দর্শন করে তাকে তীর্থদর্শনের সাথে তুলনা করেছেন। "রাশিয়ার চিঠি"র ছত্রে ছত্রে সভ্যতার পিলসুজ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অভূতপূর্ব সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদকে সভ্যতার সঙ্কট বলে ঘৃণা বর্ষন করেছেন। যখন এদেশের একদল মানুষ, সংবাদ পত্র হিটলার মুসোলিনির উগ্র জাতীয়তাবাদকে দেশপ্রেম বলে আরাধনা করেছেন, তখন রবীন্দ্রনাথ হিটলার মুসোলিনির প্রতি তীব্র ঘৃণা ব্যক্ত করেছেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে "শতাব্দীর সূর্য আজি অস্ত গেল রক্ত মেঘ মাঝে '"বলেছেন। আবার এই মানবতা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে বলেছেন 
" নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, 
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস -
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে। "

 

Comments :0

Login to leave a comment