NATUNPATA | SHARAD 1433 | STORY | AGAMANI | SUKANTA MANDOL | 18 OCTOBER 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | শারদ ১৪৩৩ | গল্প | আগমনী | সুকান্ত মন্ডল | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  SHARAD 1433  STORY  AGAMANI  SUKANTA MANDOL  18 OCTOBER 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

শারদ ১৪৩৩

গল্প

আগমনী

সুকান্ত মন্ডল

১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ 
 

শরতের ভোরে যখন প্রথম শিউলি ফুল ঝরতে শুরু করল, চারিদিক যেন মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল। মেঠো পথের ধারে শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর সাদা-কমলা শিউলিগুলো ছড়িয়ে পড়তেই বাতাসে বার্তা ছড়িয়ে পড়ল— মা এবার আসছেন! নদীর ধারে কাশের বনটা হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে, ঠিক যেন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তারা মানুষদের সঙ্গে মা দুর্গার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। আশ্বিনের নরম সোনা রোদ উঠতে না উঠতেই সবার মনটা এক নিমেষে খুশিতে ভরে গেল।
উঁচুতে বরফের দেশ কৈলাসে বসে মায়ের মনটা তখন মর্ত্যে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। স্বর্গের অশেষ সুখ, দেবালয়ের পুষ্পবৃষ্টি আর অমরাবতীর আরাম-বিলাস— কোনোকিছুই যেন দেবী পার্বতীকে আর স্বর্গধামে আটকে রাখতে পারছে না! মর্ত্যধাম থেকে ভেসে আসছে কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্য, ধুনোর মিষ্টি ধোঁয়া, আর ঢাকের চেনা কাঠির সুর। শিউলির মিষ্টি গন্ধ আর ওই ঘাসের ডগায় কাশফুলের আনাগোনা, মানুষদের বুকভরা আকুল ভালোবাসা মাটির বুক থেকে দেবীকে কেবলই টানছে! সন্তানদের ভালোবাসার টানের সামনে স্বর্গের সুখও যে আজ বড় ফিকে হয়ে গেছে।
যাবার সময় হয়ে এসেছে, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মর্ত্যে পৌঁছানোর জন্য দেবীর প্রাণ যেন উসখুস করছে। কিন্তু সমস্যা বাধাল ছোট্ট গণেশ! গণেশ বেচারা মোটু, বিশাল বড় ভুঁড়িওলা পেট! সে তো আর দুই বোনের মতো বা কার্তিকের মতো হনহন করে হাঁটতে পারে না। যাওয়ার আগে ভোলা মহেশ মুচকি হেসে দেবীকে ডেকে বললেন, "সখী, সাবধানে যেও। আর আমাদের এই গণকে একটু দেখে-শুনে আস্তে-ধীরে নিয়ে যেও। ও তো আর জোরে হাঁটতে পারে না!"
স্বামীর কথা মেনে মা উমা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক আর গণেশকে সঙ্গে নিয়ে, বাহন সিংহ বাহাদুরটিকেও সাজিয়ে দেবী পার্বতী স্বর্গধাম ছেড়ে মর্ত্যধামের পথে রওনা দিলেন। কিন্তু পথ চলতে গিয়েই বাধল বিপত্তি! একে তো গণেশ বেচারা বিরাট বড় শরীর নিয়ে ধীরে-সুস্থে আয়েশ করে হাঁটছে, তার ওপর আবার মায়ের মর্ত্যে যাওয়ার প্রচণ্ড তাড়া। আর এদিকে কার্তিক তো হাত-পা ছুঁড়ে ভীষণ লাফাচ্ছে! হাতে তীর-ধনুক, বীরের হালকা ছিপছিপে শরীর— তার তো আর তর সইছে না! গণেশের এই ঢিমে তেতালা হাঁটা দেখে কার্তিকের মেজাজ একেবারে সপ্তমে চড়ে গেল!
কার্তিক তো এমনিতেই একটু রাগী, তার ওপর গণেশের ঢিলেমির জন্য গতি কমে যাওয়া দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই ভাইয়ের মধ্যে বেশ খানিকটা মুখ-কাটাকাটি আর ঝগড়া হয়ে গেল! শেষমেশ কার্তিক রেগেমেগে মুখ ঘুরিয়ে গণেশকে পেছনে ফেলে হনহন করে একাই আগে আগে চলতে লাগল।
মা যখন সপরিবারে ধুলোমাটির মর্ত্যে এসে নামলেন, চারপাশটা তখন আলোয় আলোকময় হয়ে উঠল। কিন্তু মা তো শুধু মাটির মায়ায় আসেননি, এসেছেন অন্যায়ের বিনাশ ঘটাতেও। মায়ের দশ হাতে জ্বলে উঠল দশটা অস্ত্র, মাথায় রত্নমুকুট।
অমনি চারপাশের আকাশ এক নিমেষে মেঘ ডেকে কালো হয়ে উঠল! সেই কালো মেঘের আড়াল থেকে বিকট হুংকার দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল অত্যাচারী মহিষাসুর। তার সেই ভয়ংকর রূপ দেখে মর্ত্যের মানুষগুলো ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। মা দুর্গা এবার তাঁর আসল রূপ নিয়ে তেজস্বী হুংকার দিয়ে সিংহের পিঠে চেপে অস্ত্র উঁচিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মায়ের হাতের অস্ত্রের তেজে আর সিংহ বাহনের গর্জনে অসুরের সমস্ত মায়াবী চাল এক লহমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তারপর দেবী দুর্গা তাঁর হাতের ধারালো ত্রিশূল সজোরে বিঁধিয়ে দিলেন পাপী অসুরের বুকে! মুহূর্তের মধ্যে অত্যাচারীর বিনাশ হলো, আর চারপাশ জুড়ে শুরু হলো জয়ের উল্লাস।
অসুর বধের তাণ্ডব শেষ হতেই চারপাশ শান্ত হলো। এবার শান্ত রূপ নিয়ে প্যান্ডেলের দিকে এগোলেন সবাই। কিন্তু কার্তিকের তো রাগ এখনও কমেনি! সে সোজা গিয়ে মায়ের এক কোণে, একদম বাঁ দিকে নিজের জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদিকে গণেশ গিয়ে দাঁড়াল মায়ের ডান পাশে। দুই ভাই মনকষাকষি করে মায়ের দু’পাশে মুখ ভার করে রইল!
দুই ভাইয়ের এই মান-অভিমান আর একলা দাঁড়ানো দেখে লক্ষ্মী আর সরস্বতী আর স্থির থাকতে পারল না। দুই বোন ঠিক করল দুই ভাইকে তারা একলা রাখবে না। বিদ্যাদেবী সরস্বতী চলে গেল রাগী ভাই কার্তিকের রাগ ভাঙাতে তার পাশে, আর ধনদাত্রী লক্ষ্মী গিয়ে দাঁড়াল মিষ্টি ভাই গণেশের গা ঘেঁষে।
এইভাবেই মর্ত্যের প্যান্ডেলে প্রতিমার কাঠামোয় মা দুর্গার একপাশে লক্ষ্মী-গণেশ আর অন্যপাশে সরস্বতী-কার্তিক এসে রূপ পেল! দুই ভাইয়ের মুখ ভার দেখে মা উমা মুচকি হাসলেন। পাড়ায় পাড়ায় ঢাক বাজতে লাগল, শুরু হলো ধুনুচি নাচ— মায়ের অমল আশিস ঝরে পড়ল বাঙালির প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

Comments :0

Login to leave a comment