নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
গল্প
পুজোর জামা
সৌরীশ মিশ্র
১৯ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
রবিবারের সকাল।
সাড়ে ন'টা বাজে প্রায়।
চক্রবর্তী বাড়িতে এখন জলখাবারের পর্ব চলছে।
আজ জলখাবারে হয়েছে রুটি আর সাদা আলুর তরকারি।
বছর পনেরোর তমাল, ওর চেয়ে দু'বছরের ছোট বোন তোড়া আর ওদের বাবা তন্ময়বাবু খাচ্ছেন। খাবার দিচ্ছেন তমাল-তোড়ার মা শ্রেয়া দেবী।
"চুলটা কাটবি কবে? পাখিরা তোর মাথাটা ওদের বাসা মনে করে বসবাস শুরু করে দিলে, তবে?" থালা থেকে একটা রুটি ছিঁড়ে সেটা বাটিতে দেওয়া তরকারির ঝোলে চুবিয়ে সেটা মুখে ফেলে কথাটা বললেন তন্ময়বাবু ছেলেকে।
তোড়া বাবার কথা শুনে ফিক্ করে হেসে তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে ফোড়ন কাটল, "পাখিরা ডিমও পেড়ে যেতে পারে দাদার মাথায়, তাই না বাবা!"
তমাল বাবার বকুনি খেয়ে মাথা নীচু করে চুপচাপ খাচ্ছিল। কিন্তু, বোনের দেওয়া খোঁচাটা মেনে নিতে পারলো না সে। কটমট করে তাকালো সে তোড়ার দিকে।
তোড়াও দমবার পাত্রী নয়। সে ভেংচি কাটলো দাদাকে।
"খেয়ে উঠেই যাবি চুল কাটতে, এই বলে দিলাম।" বেশ কড়া ভাবেই কথাটা বললেন ছেলেকে তন্ময়বাবু।
সত্যিই চুলটা বেশ বড়ই হয়েছে তমালের। আসলে, কিছুদিন ধরেই ছুটির দিনগুলো এলেই তমাল ভাবছিল চুল কেটে আসবে গিয়ে। কিন্তু, কিছু না কিছু কারণে হয়ে ওঠেনি সেটা।
রুটির একটা টুকরোয় তরকারি ভরে সেটা মুখে চালান করে দিয়ে তমাল মনে-মনে ঠিক করে ফেলে, সে জলখাবার খেয়েই বেড়িয়ে পড়বে চুল কাটাতে।
তমাল বেরোলোও সেই মতোনই।
তমাল আর ওর বাবা চুল কাটেন উমেশ নামের এক নাপিতের কাছে। বিহারের দ্বারভাঙায় দেশ তার। কিশোর বয়সেই চলে এসেছিল সে এই বাংলায়। কয়েক দশক হয়ে গেছে তার এখানে। বাংলা এমন পরিস্কার বলে যে, না বলে দিলে কেউ ধরতেই পারবে না যে সে আদতে একজন বিহারের মানুষ।
তমালদের বাড়ির কাছেই যে বড় বাজারটা বসে, যেটাকে এই অঞ্চলের সবাই বলে মহামায়ার বাজার, সেইখানেই একটা বড় গাছের তলায় একটা কাঠের চেয়ার নিয়ে বসে সে। গাছের মোটা কাণ্ডে ঝোলানো থাকে আয়না। তার সামনে রাখা থাকে কাঠের চেয়ারটা। সেটায় বসিয়ে খদ্দেরদের চুল-দাড়ি কাটে উমেশ।
হাঁটতে-হাঁটতে তমাল চলে এল বাজারে। এবার ডানদিকে একটু গেলেই সেই গাছটা, যে গাছের নীচে উমেশ বসে।
ঐ গাছটার কাছে তমাল গিয়ে দেখল, উমেশের কাছে মাত্র একজন খদ্দের আছে। উমেশ লোকটার দাড়ি কামাচ্ছে।
একমনে কাজ করছিল উমেশ, তাই খেয়াল করেনি সে যে তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তমাল।
তমাল ডাকল, "উমেশকাকু..."
"কে!" ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় উমেশ। তারপর তমালকে দেখে বলে চলে, "ও, খোকাবাবু তুমি। চুল কাটবে?"
"হ্যাঁ।" বলে তমাল।
"ঠিক আছে। বসো একটু তুমি। এনার হয়ে যাবে এক্ষুনি। তারপর তোমারটা কেটে দেবো।" টানা কথাগুলো বলে থামে উমেশ।
তমাল যখন একদম ছোটো সেই তখন থেকে তমালের চুল কেটে আসছে উমেশ। তমালকে ভালোবাসে সে খুব। তমালের ব্যবহার সবার সাথেই এতো ভালো যে কেউ ওকে না ভালোবেসে থাকতেই পারে না।
উমেশের এই দোকানে যেসব খদ্দেরদের অপেক্ষা করতে হয় তাদের বসার জন্য একটা কাঠের বেঞ্চি আছে। তমাল ওটায় গিয়ে বসলো।
উমেশ দাড়ি কাটছে ওর সেই খদ্দেরের। উমেশের দিকে তাকালো তমাল। উমেশের চেহারাটা যে বেশ খারাপ হয়েছে এবং তা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেটা তার নজর এড়ায় না। এই তো মাস খানেক আগেও দেখেছে তমাল ওকে। ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল সাইকেলে চড়ে! তখন তো স্বাস্থ্যটা তার এতোটা খারাপ ছিল না!
মিনিট পাঁচেক বাদেই তমালের টার্ন এলো। আর, ওর চুল কাটা কমপ্লিট হতে লাগলো আরো মিনিট দশেক।
সে চেয়ার থেকে উঠে ওর প্যান্টের পকেট থেকে বের করলো একটা পঞ্চাশ টাকার নোট। সেটা এগিয়ে দিল সে উমেশের দিকে।
উমেশ সেটা ওর জামার বুক পকেটে ঢুকিয়ে তারপর হঠাৎ কেন জানি তমালের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিল একটু।
ব্যাপারটা অবাকই করে তমালকে। তাই সে জিজ্ঞেস করেই বসলো, "উমেশকাকু, তুমি হঠাৎ আমাকে আদর করলে!"
"হ্যাঁ বাবু। একটু আদর করে দিলাম তোমায়। আর কোনোদিন তোমার সাথে দেখা হবে কি হবে না তাতো জানি না..."
"মানে!"
"আমি পরের হপ্তায় দেশে চলে যাচ্ছি একেবারের মতোন।"
"সে কি! কেন?"
"আমার শরীরটায় খুব শক্ত একটা রোগ বাসা বেঁধেছে গো। এ রোগ না কি সারার নয়। এখানের ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। সে বড় ডাক্তার। টেস্ট করালেন অনেকগুলো। তারপর ডাক্তারবাবু বললেন ঐ কথা। বললেন, ক'দিনের মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যেতে আমায়। দেরী না করতে একদম। দেশে জানালাম সব। বাড়ির লোকজন বলল, এখানের যতটুকু যা আছে বেচে চলে আসতে সেখানে। তাই, চলে যাচ্ছি। ওখানেই ট্রিটমেন্ট করাবো। মনটা বহুত খারাপ। এখানে আছি চল্লিশ বছরেরও বেশি। আমার কাছে আমার দ্বারভাঙা যতটা, এই বাংলাও ততটা।" বলতে-বলতে চোখে জলই চলে আসে উমেশের।
সে চশমা খুলে তার প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মোছে। তারপর ফের একবার তমালের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে থাকে, "খোকাবাবু, তোমার ভালো হোক। বহুত বড় মানুষ হও তুমি। বড় চাকরি কোরো। তোমার বাবা-মা-কে দেখো।"
উমেশকাকুর কথাগুলো শুনে কান্না পেয়ে যায় তমালের। দু'চোখের পাতাও যে তার ভিজে গিয়েছে সে তা বুঝতে পারে। তাই, ওর চোখে যে জল সেটা যাতে দেখতে না পেয়ে যায় উমেশ, তমাল "আমি এলাম উমেশকাকু।" এইটুকু বলেই উমেশের সামনে থেকে তাড়াতাড়ি সরে আসে সে।
তমাল এখন ফুটপাথ ধরে হাঁটছে। আর উমেশের কথা ভাবছে। তখনই, হঠাৎই, একটা কথা মাথায় এলো তার। প্রতিবছর পুজোয় তো বাবা উমেশকাকুকে একটা নতুন জামা উপহার দেয়। আর কিছুদিন বাদেই তো পুজো। কিন্তু, উমেশকাকু তো চলেই যাচ্ছে। আর আসবে না। তার পুজোয় এখানে থাকার কোনো প্রশ্নই নেই। তাই, যদি বাবা উমেশকাকুর জন্য একটা জামা কিনে এখনই দিয়ে দেয় ওকে তো বেশ হয়।
সাথে তমাল এও ভাবল, ওর বাবার যে মন কতো বড়, সে তা ভালোই জানে। মাসের শেষের দিক এখন হলেও না করবে না যে ওর বাবা কখনো তার এই প্রস্তাবে, সে তা এখনই হলফ করে বলে দিতে পারে।
তবে, যাই করতে হবে তা খুব ফাস্ট করতে হবে। হাতে সময় নেই বললেই চলে।
বাবাকে বাড়িতে গিয়েই, উমেশকাকু চলে যাচ্ছে দেশে, সেই খবরটা দিতে হবে। তারপর বাবাকে ওর আইডিয়াটা মানে উমেশকাকুকে এখনই পুজোর জামাটা কিনে দেওয়ার ব্যাপারটা, বলতে হবে। এরপর, উমেশকাকুর জামাটা কেনা আছে। সেটা আবার উমেশকাকুর দেশে যাওয়ার আগে তার হাতে তুলে দেওয়া আছে।
কত্তো কাজ! তাই, আর এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট নয়, মনে মনে নিজেকেই বলে তমাল। তারপর যতটা সম্ভব ততটা দ্রুত পায়ে সে এগিয়ে চলে ওদের বাড়ির দিকে।
-----------------------------
Comments :0