Rail hawker rally

পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়, শিয়ালদহ সোচ্চার সমাবেশ হকারদের

রাজ্য কলকাতা

শিয়ালদহ স্টেশনের সামনে সমাবেশে হকারদের জমায়েত। ছবি- রবিন গোলদার, ভিডিও - সায়ন মাইতি।

পূজা বোস

লাগাতার উচ্ছেদের প্রতিবাদে শিয়ালদহে বিশাল সমাবেশ করলেন রেল হকাররা। পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন হকার সংগঠনের ডাকে হয় সমাবেশ। সম্মিলিত ভাবে হকাররা স্লোগান তুলেছেন পুনর্বাসন ছাড়া কোনও হকার উচ্ছেদ করা যাবে না। না হলে এমন প্রয়াসকে প্রতিহত করা হবে।  
এদিন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিআইটিইউ রাজ্য সভাপতি অনাদি সাহু, পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি অলকেশ দাস, সম্পাদক দীপঙ্কর শীল, সিআইটিইউ নেত্রী গার্গী চ্যাটার্জি, পশ্চিমবঙ্গ স্ট্রিট হকার্স ফেডারেশনের রাজ্য সভাপতি দেবাশিস দে। 
অনাদি সাহু বলেন, ‘‘শুভেন্দু অধিকারী যখন বিরোধী দলনেতা ছিলেন তখন হকার উচ্ছেদের বিপক্ষে বলেছিলেন। তাহলে আজ কেন বুলডোজার চলছে। বিজেপি রাজ্যের সরকারে আসীন হওয়ার পরই কেন শিয়ালদা স্টেশনে, হাওড়া স্টেশন সহ বিভিন্ন জায়গায় রাতের অন্ধকারে ধ্বংস করে দেওয়া হল হকারদের পসড়া? তিনি বলেন, ‘‘বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে মানুষ হকারি করবেন কেন!’’  
সাহু বলেন, ‘‘এই লড়াই আমাদের সকলের এ লড়াই। প্রধানমন্ত্রী সহ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলছি যে হকারদের সঙ্গে বসুন। সব হকার সংগঠনের সঙ্গে কথা বলুন।’’  
অলকেশ দাস বলেন, "দরকার হলে আমরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাব। তাঁকে মনে করাবো তিনি কী বলেছিলেন ভোটের আগে। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় প্রস্তাব রাখুন পুনর্বাসন ছাড়া হকারদের উচ্ছেদ করা যাবে না।" 
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে হকারদের উপর বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ নামে আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্টেশন থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া হচ্ছে রেল হকারদের। পাশাপাশি বিজয় মিছিলের নাম করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নিউ মার্কেট সহ বিভিন্ন অঞ্চলের হকারদের পসরা। এর প্রতিবাদে আজ শিয়ালদহ স্টেশনের সামনে রেল হকারদের একটি বিশাল সমাবেশ হয়। শিয়ালদহ থেকে সোনারপুর বা বিরাটির মতো বহু রেল স্টেশনে হকার সংগঠনগুলির সঙ্গে স্থানীয় মানুষ উচ্ছেদ প্রতিরোধ করেছেন।  
অলকেশ দাস বলেন, ‘‘এই সমাবেশে সব রেল হকারদের। এতদিন কে কোন ঝাণ্ডা ধরেছেন সে সব ভুলে সব হকাররা এক না হলে আমাদেরই পেটে লাথি খেতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘কলকাতা হাইকোর্টে আমাদের আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য আমাদের হয়ে লড়াই করেছেন। কোর্ট বলছে আমাদের উচ্ছেদ করা যাবে না। তাই আমাদের গায়ে হাত দেওয়ার আগে একবার হলেও ভাবতে হবে। সোনারপুর, বালিগঞ্জের সহ একাধিক স্টেশনের দিকে আমাদের হকারদের সরে যেতে বলছে।  বিভিন্ন প্রলোভনও দেখাচ্ছে। আমরা বলেছি একটা দোকানের পসরাও নামাবেন না। ওরা বুঝে গেছে যে সাধারণ যাত্রীরা যা পছন্দ করেন হকাররা সেই জিনিসপত্র দিয়েই পসরা সাজান। এরকম চলতে থাকলে তো  আদানি-আম্বানির কোনও লাভ হবে না। তাই জন্য আমাদেরকে উঠিয়ে দিতে চাইছে।"
তিনি বলেন, ‘‘রেলের হকারদের লাইসেন্স আমরা চাই, বহুদিন থেকেই এই দাবি আমরা জানাচ্ছি। আমাদের জন্য সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।‘‘ 

 


দীপঙ্কর শীল বলেন, ‘‘নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে কৃষ্ণনগর, দমদম, বেলঘড়িয়া, সোনারপুর সব জায়গায় হকারদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এই সরকার আসীন হওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে। এঁদের বিরুদ্ধে সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ঝান্ডা নির্বিশেষে লড়াই করতে হবে।’’ 
তিনি আরও বলেন, ‘‘উচ্ছেদের বিষয়ে আমরা ডিআরএম'র সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাদের আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এই অত্যাচার বন্ধ হবে। কিন্তু তা পূরণ হয়নি, আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে কারখানায় কাজ পেলে কেউ হকারি করত না। লাখো লাখো হকার এই সমাবেশে অংশ নিয়েছে। এরপরে আমরা হাওড়া যাব, সেখানে ডিআরএম এর কাছে ডেপুটেশন দেব। দরকার হলে এরপর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাবো। তাতেও কাজ না হলে আমাদের দিল্লি যেতে হবে, সেখানে রেল রোকো করব, আমরা আমাদের হকের দাবি, পুনর্বাসনের দাবি আদায় করতে যতদূর যেতে হয় যাবো।’’ 
সভার মাঝেই খবর আসে যে শিয়ালদহ স্টেশনের মধ্যে রেল পুলিশ হকারদের ওপর লাঠি চার্জ করছে। শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরের রাস্তায় দেখা যায় বুলডোজার।
গার্গী চ্যাটার্জি বলেন, ‘‘স্টেশনের ভেতরে আরপিএফ-জিআরপিএফ যারা আমাদের‌ হকার ভাই-বোনদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনছে, তাদের বলছি, আপনারা যদি এই অত্যাচার বন্ধ না করেন তাহলে আমরাও শিয়ালদহের মধ্যে আমাদের অধিকার আমরা বুঝে নেব।’’ 
তিনি বলেন, ‘‘এই হকার ভাই-বোনেরা যদি না থাকে তাহলে ওই বেশি টাকায় বড় দোকান থেকে রোজ খাবার খেতে হবে। সাধারণ মানুষ মাসে যে রোজগার করেন তা কদিনেই খরচ হয়ে যাবে। ‘পিন‘ থেকে ‘এলিফ্যান্ট‘- এই হকাররা আছে বলে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সরকার চায় না যে পাঁচ টাকায় সাধারণ মানুষ চা খান।‘‘ তিনি বলেন, ‘‘হকারদেরও একটা ইতিহাস আছে। যেদিন প্রথম দেশে ট্রেন চলল সেদিন থেকেই হকাররা ছিল। ব্রিটিশরা আমাদের ট্রেন থেকে নামাতে পারেনি, এরা তো কোন ছাড়। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন হকারদের উচ্ছেদ করতে হলে বুলডোজারের সামনে তিনি চলে আসবেন। কিন্তু এখন আমরাই রয়েছি, তিনি নেই।’’ 
দেবাশিস দে বলেন, ‘‘দেশ ও রাজ্যের সরকার সম্মিলিতভাবে হকারদের উপর আক্রমণ চালিয়ে আনছে। গ্রাউন্ড ভেন্ডিং কমিটি বলেছিল যে স্ট্রিট হকারদের লাইসেন্স দিতে হবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, কিন্তু তা করা হয়নি। আমাদের লড়াই আমাদেরই করতে হবে, ছিনিয়ে নিতে হবে আমাদের অধিকার।’’

Comments :0

Login to leave a comment