Murasu

ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’-র তাণ্ডবে বিপর্যস্ত অন্ধ্রপ্রদেশ, উপড়ে পড়ল হাজার হাজার গাছ, বিদ্যুৎ ও রেল পরিষেবা ব্যাহত

জাতীয়

প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’-র আঘাতে বিপর্যস্ত অন্ধ্রপ্রদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা। মঙ্গলবার ভোররাতে ওঙ্গোলের কাছে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়ে এই ঘূর্ণিঝড়। প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় একাধিক জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি ও বিদ্যুৎ পরিষেবা। ক্ষতি হয়েছে মাছ ধরার নৌকা এবং কৃষিজ ফসলেরও। বিভিন্ন জায়গায় জল জমে বিপর্যস্ত হয়েছে জনজীবন। ব্যাহত হয়েছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ।
ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (আইএমডি) জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর ৩টে ৩০ মিনিট থেকে ৫টা ৩০ মিনিটের মধ্যে নেল্লোর ও নরাসাপুরের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে, ওঙ্গোলের কাছাকাছি স্থানে স্থলভাগে প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড়টি। সেই সময় ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার। সর্বোচ্চ দমকা হাওয়ার গতিবেগ পৌঁছেছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস, মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি হারিয়ে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে। রাতের মধ্যে তা গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলবর্তী একাধিক এলাকায় প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়। জাতীয় সড়কের বিভিন্ন জায়গায় জল জমে আটকে পড়ে যানবাহন। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েন গাড়িচালকরা। বহু এলাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়। ঝড়ের সময় ওঙ্গোল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার, কাভালি থেকে ৫০ কিলোমিটার, বাপটলা থেকে ৭০ কিলোমিটার, নেল্লোর থেকে ১০০ কিলোমিটার এবং মাচিলিপত্তনম থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল ঘূর্ণিঝড়টি।
স্থলভাগে প্রবেশ করলেও ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ পুরোপুরি কাটেনি বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া দপ্তর। মঙ্গলবারও অন্ধ্রপ্রদেশের একাধিক জেলায় প্রবল বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। কৃষ্ণা, গুন্টুর, বাপটলা, পালানাডু, মার্কাপুরম ও প্রকাশম জেলায় জারি করা হয়েছে লাল সতর্কতা। এই জেলাগুলির বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
আইএমডি অমরাবতীর বিজ্ঞানী ডঃ করুণা সাগর জানিয়েছেন, উপকূলে আছড়ে পড়ার সময়ও ঘূর্ণিঝড়টি যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। রাডারের ছবিতে বাপটলা, প্রকাশম, কৃষ্ণা, এনটিআর এবং গুন্টুর জেলায় ঘন মেঘের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। তার বক্তব্য, এই জেলাগুলিতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি কিছু এলাকায় অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে। নন্দিয়াল, নেল্লোর, তিরুপতি, এলুরু, পশ্চিম গোদাবরী ও পূর্ব গোদাবরী জেলাতেও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশ করলেও ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। বিদ্যুতের তার ও খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গাছ উপড়ে পড়া এবং দুর্বল বাড়িঘরের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষ্ণা, গুন্টুর ও বিজয়ওয়াড়ায় লাগাতার বৃষ্টির জেরে পুকুর ও ছোট নদীতে জলস্তর বাড়তে পারে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সাধারণ মানুষকে বাড়ির ভিতরে থাকার এবং সরকারি নির্দেশ না আসা পর্যন্ত অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্ধ্রপ্রদেশ আবহাওয়া দপ্তরের অধিকর্তা কে নাগারত্নাও জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে শক্তি হারালেও প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। বুধবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৫টা পর্যন্ত জেলা গড় বৃষ্টিপাতের নিরিখে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বাপটলায়। সেখানে বৃষ্টির পরিমাণ ৪০.০২ মিলিমিটার। প্রকাশম জেলায় ২৬.৫৬ মিলিমিটার, পশ্চিম গোদাবরীতে ২৩.৩৬ মিলিমিটার, কৃষ্ণায় ২৩.১৫ মিলিমিটার, গুন্টুরে ১৯.০৯ মিলিমিটার এবং শ্রীকাকুলামে ১৮.৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
উপকূলবর্তী কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ আরও বেশি। সোমবার রাত ১০টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রকাশম জেলার কোঠাপত্তনমে ১৬৪.২৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এনজি পাড়ুতে ১১৪.১৯ মিলিমিটার, বাপটলার চিরালায় ৯৯.৫৯ মিলিমিটার, ত্রোভাগুন্তায় ৯১.৯৫ মিলিমিটার, পশ্চিম গোদাবরীর মোগলতুরে ৭৯.৩৪ মিলিমিটার এবং কোনাসীমার মালিকিপুরমে ৭৪.৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আগামী চার দিন বাপটলা, গুন্টুর, কৃষ্ণা, পালানাডু, এনটিআর, এলুরু ও পশ্চিম গোদাবরী জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমডি। পূর্ব গোদাবরী, পোলাভরম, কাকিনাড়া, কোনাসীমা, প্রকাশম ও মার্কাপুরম জেলাতেও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলায় প্রশাসনের তরফে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এনটিআর জেলার কালেক্টর লক্ষ্মীশা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত জেলায় বড় ধরনের কোনও বিপর্যয়ের খবর নেই। তবে ভূমিধসের আশঙ্কায় মোগলরাজপুরম এলাকার কয়েকটি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষকে বাড়িতে থাকার, অপ্রয়োজনে যাতায়াত এড়ানোর এবং শিশুদের বাইরে যেতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গে কথা বলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মুখ্যমন্ত্রী তাকে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব ও মুরাসুর প্রভাবে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার ফসল ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির কথা জানান। পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণের কাজের অগ্রগতিও তুলে ধরেন।
পাশাপাশি পরপর ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যের পুনর্গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়েছে রেল পরিষেবাতেও। বিজয়ওয়াড়া-ওঙ্গোল-গুডুর রেলপথে একাধিক ট্রেনের চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে অথবা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। মোট সাতটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। পিনাকিনী এক্সপ্রেসের যাত্রা দু’ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চারটি দূরপাল্লার ট্রেনের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী ওড়িশা ও তামিলনাড়ুতেও। ওড়িশার দক্ষিণের জেলাগুলিতে হালকা বৃষ্টিপাত হয়েছে। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি জানিয়েছেন, কোরাপুট, মালকানগিরি, কন্ধমাল ও কালাহান্ডি-সহ একাধিক জেলার প্রশাসনের কাছ থেকে বৃষ্টির খবর পাওয়া গিয়েছে। তবে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কায় সতর্ক রয়েছে প্রশাসন।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের আরও কিছু সময় নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হবে। ইতিমধ্যেই ওড়িশায় ১ লক্ষ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দক্ষিণের পাঁচটি জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।
অন্যদিকে, তামিলনাড়ুতে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। উত্তর তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরির বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ও সংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর থেকে তৈরি হওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে মধ্যরাত থেকেই পুদুচেরিতে লাগাতার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মুরাসু ক্রমশ শক্তি হারালেও অন্ধ্রপ্রদেশ-সহ দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে দুর্যোগের আশঙ্কা এখনও কাটেনি। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।

Comments :0

Login to leave a comment