Bangladesh Garment Workers

পোশাক শিল্পে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে উত্তেজনা বহাল বাংলাদেশে, গঠিত নতুন মজুরি বোর্ড

আন্তর্জাতিক

মীর আফরোজ জামান: ঢাকা

মাসে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দমানোর চেষ্টায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। তার প্রতিক্রিয়ায় গাজীপুরের কয়েকটি জায়গায় যানবাহন, পুলিশি স্থাপনা ও পুলিশের গাড়ীতে ও কারখানার সম্পত্তিতে আগুন লাগানো এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। রবিবার অন্তত ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, এর ফলে প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়েছে।
সোমবার বেশ কিছু কারখানা খুললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। ঢাকার মিরপুরে শ্রমিকেরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখান। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং আশুলিয়া-সাভারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও অবরোধের ঘটনা ঘটে। 
কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। মিরপুরে সংঘর্ষের জেরে মেট্রোরেলের কয়েকটি স্টেশন প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিষেবা চালু হয়।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি-অসন্তোষ। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি, তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। পাশাপাশি ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে নেওয়া, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধ করা এবং বকেয়া পাওনা মেটানোর দাবিও উঠেছে। 
শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারদরে এই মজুরিতে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া, চাল-ডাল, তেল, শাকসবজি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর হাতে প্রায় কিছুই থাকে না।
মজুরি নিয়ে এই অসন্তোষ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া সর্বশেষ মজুরি কাঠামোয় পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই মজুরি আর কার্যকর থাকছে না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেছেন, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কম। তাঁর মতে, মালিকেরা যদি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে না পারেন, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পোশাকের দাম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। শ্রমিকদের কম মজুরির উপর নির্ভর করে শিল্প চালানো যায় না।
উল্লেখ্য, শ্রমিকদের প্রাপ্য না দিয়ে কম খরচে রপ্তানি পণ্য তৈরি করে বহুজাতিককে বিক্রি করার কৌশল উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশেই নেওয়া হয়। রপ্তানির বাজার ধরতে কমানো হয় খরচ। যার দায়ভার নিতে হয় শ্রমিকদেরই। তা নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে।
আন্দোলনের জেরে রবিবার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন বরিষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই বোর্ড পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে। শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে রয়েছেন বাবুল আখতার। তবে কবে নাগাদ সুপারিশ জমা পড়বে এবং নতুন মজুরি কবে কার্যকর হবে, তা এখনও নির্দিষ্ট হয়নি। শ্রমমন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে কিছু রাজনৈতিক সংগঠন অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে সরকারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, মজুরি ও কর্মক্ষেত্রের সমস্যার সমাধান না হওয়াই বিক্ষোভের মূল কারণ। ফলে আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক উসকানির ফল হিসেবে দেখলে শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যাগুলি আড়ালে থেকে যাবে।
অন্যদিকে, মালিকপক্ষও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-র বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে কম দামে অর্ডার পাওয়ার চাপের মধ্যে রয়েছে শিল্প। এই পরিস্থিতিতে এক ধাক্কায় মজুরি অনেকটা বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment