নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR)-কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লিতে বিক্ষোভে নামলেন সিপিআই(এম)-সহ বিরোধী শিবিরের নেতারা। মঙ্গলবার সিপিআই(এম)-এর নির্বাচন কমিশন দফতরের দিকে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে যাওয়ার সময় দিল্লি পুলিশ দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, পলিটব্যুরো সদস্য বি ভি রাঘাভুলু ও আর অরুণ কুমার, প্রবীণ নেত্রী বৃন্দা কারাট ও সুভাষিণী আলি, দিল্লি রাজ্য সম্পাদক অনুরাগ সাক্সেনা, রাজ্যসভার সাংসদ ভি শিবদাসন-সহ একাধিক নেতাকে হেনস্থা ও আটক করে।
বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদ থেকে সরাতে হবে, এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে এবং ভোটার তালিকা থেকে ভুলভাবে বাদ পড়া প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার পুনর্বহাল করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী ও তার সংস্কারের দাবিও তুলেছে বাম দলগুলি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন ও এসআইআর-বিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বরও জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালীন একাধিক ছাত্র, যুব ও সমাজকর্মীকে পুলিশ আটক করেছিল।
ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কোনও নতুন প্রক্রিয়া নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যাপক পরিসর এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া এসআইআর পরবর্তীতে দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে এবং খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী এসআইআর এবং ভোটার-তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার নথিভুক্ত আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়। সিপিআই(এম), সিপিআই এবং সিপিআই(এমএল)-লিবারেশন জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং এসআইআর অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলি মানেনি। ২৩ সেপ্টেম্বর কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসআইআর-সহ কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্ত পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ কোনও একজন কমিশনার একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই অভিযোগকে কমিশন অস্বীকার করেছে।
ফলে একদিকে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে কমিশনের বক্তব্য, সিদ্ধান্তগুলি সাংবিধানিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া মেনেই এবং পূর্ণ কমিশনের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছে। এই দুই বিপরীত অবস্থানই বর্তমানে বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
এসআইআর নিয়ে আইনি বিতর্কও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট বিহারের এসআইআর-এর আইনি বৈধতা বহাল রাখলেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালত স্পষ্ট করে যে ভোটার তালিকা থেকে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ পড়া নিজে থেকেই তাঁকে ভারতীয় নাগরিক নন বলে ঘোষণা করে না।
এই বিষয়টিই বর্তমানে বিরোধী দলগুলির অন্যতম যুক্তির জায়গা। ভোটার তালিকা থেকে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়লে তার ভোটাধিকার কীভাবে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের জেরে বিরোধী দলগুলির মধ্যেও সমন্বয় বাড়ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে সিপিআই(এম) এর চেষ্টায় ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, এসআইআর এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবিও বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ইস্যুতে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, এসআইআর এখন শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটাধিকার, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এই তিনটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিল্লিতে সিপিআই(এম) নেতাদের আটক করার অভিযোগ সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুললো।
CPIM
এসআইআর বিতর্কে দিল্লিতে বিক্ষোভ, আটক বেবি সহ একাধিক
×
Comments :0