SIR

অস্তিত্বহীন ভোটারদের জন্যই তৈরি করা ভুয়ো নথি? সন্দেহ কমিশনের, পাঁচ জেলায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভুয়ো নথি আপলোড

রাজ্য

সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভুয়ো নথি তৈরি করে আপলোড করার জন্য রাজ্যের পাঁচ জেলাকে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। 
কমিশন সূত্রের খবর, রাজ্যের পাঁচ জেলায় বিধানসভা ভিত্তিক নথি আপলোডের পর্যবেক্ষণে কমিশন ব্যাপক হারে ভুয়ো নথি তৈরি করে আপলোড করা হয়েছে বলে চিহ্নিত করেছে। পাঁচ জেলার মধ্যে কমিশনের দাবি, কোচবিহার, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা আছে। আংশিকভাবে ভুয়ো নথি আপলোড করার তালিকায় আছে পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমান জেলাও।
কোচবিহার জেলায় লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির জন্য প্রায় ৭ লক্ষ ভোটারকে ডাকা হয়েছিল। মালদহ জেলায় ৯ লক্ষ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ১৫ লক্ষ ভোটারকে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি চিহ্নিত ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। একইসঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অসঙ্গতি চিহ্নিত ভোটারদের মধ্যে যথাক্রমে ১৫ লক্ষ ও ২০ লক্ষ ভোটারের শুনানিতে ডাক পড়ে। লজিক্যাল ডিসক্রেপিন্সের বাইরে আনম্যাপড চিহ্নিত ভোটারদের শুনানিতে আসতে হয়েছে। শুনানি নোটিশ পাওয়া ভোটারদের নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ডকুমেন্টই জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু তা যে হয়নি তা স্পষ্ট। কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, ‘‘ এখনও পর্যন্ত আপলোড হওয়া নথি যাচাই করার পর বিধানসভা ভিত্তিতে প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভুয়ো নথির অস্তিত্ব টের পাওয়া গেছে। কোচবিহার, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভুয়ো নথি তৈরি করে আপলোড করার ঘটনা কমিশনের নজরে এসেছে।’’
এখানেই গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে কমিশনের অন্দরে। শুনানিতে আসা ভোটারদের সিংহভাগই ভোটার কার্ড, আধার কার্ড কিংবা প্যান কার্ড নিয়ে শুনানিতে উপস্থিত হয়ে ছিলেন। ফলে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ডকুমেন্ট না হওয়ার কারণে এই ভোটারদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকার সুযোগ প্রায় থাকছে না। বৈধ নাগরিক হয়েও এসআইআর’এ কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী বড় অংশের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। কিন্তু সাদা পাতা, খবরের কাগজের কাটিং থেকে অস্পষ্ট ছবি দিয়ে নথি আপলোড করার পর কমিশন মনে করছে, আসলে অস্তিত্বহীন ভোটারদের তালিকায় রেখে দেওয়ার জন্যই কী সব জানার পরও আপলোড করা হয়েছে। কমিশন মনে করিয়ে দিচ্ছে, এসআইআর চালু হওয়ার আগেই স্রেফ নমুনা তদন্ত করতে গিয়ে বারুইপুর পূর্ব ও ময়না বিধানসভা কেন্দ্রে অস্তিত্বহীন ভোটারের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ময়না কেন্দ্রে ৮৭ জন ও বারুইপুর পূর্ব কেন্দ্রে ৩৮ জন অস্তিত্বহীন ভোটারের উপস্থিতি উঠে এসেছিল। এক আধার কার্ড দিয়ে একাধিক ভোটারের নাম নথিভুক্ত করার অভিযোগ সামনে আসার ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। নির্বাচন কমিশন এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রের ইআরও, এইআরও ও একজন অস্থায়ী ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারকে এফআইআর করার নির্দেশ দেয়। সরকার এখনও সেই নির্দেশ পালন করেনি। 
তারমধ্যেই ২৪ ঘন্টা আগে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে কমিশনের এরাজ্যের সিইও, রোল অবজার্ভার ও জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের বৈঠকেই প্রকাশ্যে আসে খবরের কাগজের কাটিং, সাদা পাতা থেকে অস্পষ্ট ছবি দিয়ে ভোটারদের নথি আপলোড করার গুরুতর অভিযোগ। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে এই তথ্য সামনে আসার পর এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটারদের শুনানির পর নথি আপলোড নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। কমিশনের শীর্ষ আধিকারিকদের কথায়, ‘‘ সাদা পাতা, খবরের কাগজের কাটিং’কে নথি আপলোড বলে চালিয়ে দেওয়ার ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন। যাঁরা এই কাজ করেছেন তাঁরা জেনে বুঝে ভুয়ো তথ্য আপলোড করেছেন।’’ 
কমিশন মনে করছে, ‘‘ সাধারণ ভোটাররা কোনোভাবেই শুনানিতে এসে সাদা কাগজ জমা দিয়ে চলে যাবে না। এমনকি তা দিলেও শুনানিতে উপস্থিত মাইক্রো অবজার্ভার থেকে অন্যান্য নির্বাচন কর্মীদের নজর এড়ানো কঠিন। কিন্তু সাদা কাগজ থেকে খবরের কাগজের কাটিং’কে নথি হিসাবে গণ্য করে আপলোড করা দেওয়ার ঘটনা রীতিমত সন্দেহজনক।’’ 
শনিবারই রাজ্যে শুনানির কাজ শেষ হয়েছে। আগামী রবিবার থেকে সাতদিন সময় থাকছে শুনানিতে আসা ভোটারদের নথি যাচাই ও আপলোড করার। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি এই কাজের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে কমিশন। ফলে এখন রাজ্যের প্রতিটি জেলায় এসআইআর’এর কাজের সঙ্গে যুক্ত ডিইও, ইআরও ও এইআরও’দের দায়িত্ব নথি যাচাই করার। একইসঙ্গে সেই নথি যাচাই করার পর কমিশনও তার ওপর কড়া নজরদারি করবে।

Comments :0

Login to leave a comment