বখতিয়ার আবিদ চৌধুরি: ঢাকা
ভোট প্রবণতার সঙ্গে মিলিয়েই চূড়ান্ত ফলাফলেও বিপুল জয় পেলো বিএনপি। দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে চলেছেন তারেক রহমান। শুক্রবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। শেরপুর-২ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন হয়নি এবং চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে আইনি জটিলতায় ফলাফল স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। বাকি আসনের প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী বেসরকারিভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। নির্বাচনের ফলের সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের মানুষ ফের ধর্মীয় মৌলবাদী জামায়াতকে রুখে দিয়েছেন। ভোটের আগে তাদের এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথাও বলা হয়েছিল।
জামায়াত জোটের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৬টি আসনে জয় পেয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির শীর্ষ তিন নেতা আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ জিতলেও হেরে গেছে অন্য শীর্ষ নেতা সারজিস আলম ও নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারি। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ঢাকা ৮ আসনে পাটওয়ারির হেরে যাওয়া। এই কেন্দ্রেই ওসমান হাদির প্রার্থী হওয়ার ছিল। কিন্তু ভোট ঘোষণার পরেই খুন হয় ওই ছাত্রনেতা। তারপর গোটা বাংলাদেশ জুড়ে তাণ্ডব চলে উগ্রবাদীদের। সেই কেন্দ্রে বিএনপি’র মির্জা আব্বাসের কাছে হেরে গেছেন পাটওয়ারি। জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখদের তৈরি দলটি ভোটে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে এবারের নির্বাচনেই জামায়াত সর্বাধিক ভোট এবং আসন পেয়েছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লিগ এই নির্বাচনে না থাকায় বিএনপি বা জামায়াতের এই ফলাফলকে একমাত্রিকভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের হার ৫৯.৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে গণভোটে প্রদত্ত ভোটের হার সংসদ নির্বাচনের চেয়ে কিছুটা বেশি, যা ৬০.২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। সংসদ নির্বাচনী ভোট থেকে গণভোটে বেশি ভোট পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রধান সচিব মহম্মদ আখতার আহমেদ বলেন, ‘সংসদীয় ভোটের থেকে গণভোটের শতাংশ বেশি হওয়ার কারণ হলো, আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রামের দুটি আসনের সংসদীয় ফলাফল স্থগিত থাকলেও সেখানে গণভোটের গণনা যুক্ত হয়েছে।’
বাংলাদেশের সংসদে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেল এবারে। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে মোট ৮৫ জন নারী প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৭ জন বিজয়ী হয়েছেন। জয়ী মহিলা প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী ছিলেন বিএনপির সাবেক ‘সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক’ রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র (নির্দল) প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দল তাকে বহিষ্কার করে। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। রুমিন ফারহানা ছাড়াও আরও ৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এই প্রার্থীদের সবাই বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র ভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থীরা আলোচনা তৈরি করেও আশানুরূপ ফল ঘরে তুলতে পারেননি। খুব কম প্রার্থী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চার জন প্রার্থী জয় লাভ করেছেন। এই প্রার্থীদের সবাই ছিলেন বিএনপি মনোনীত। ঢাকা–৩ আসন থেকে জয় পেয়েছে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির এই সদস্য পেয়েছে ৯৮ হাজার ৭৮৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলাম পেয়েছে ৮২ হাজার ২৩২ ভোট। মাগুরা-২ আসনে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মহম্মদ মুশতারশেদ বিল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ১৮ ভোট। বান্দরবান থেকে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছে সাচিং প্রু। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আবু সাঈদ মহম্মদ সুজাউদ্দীন পেয়েছেন ২৬ হাজার ১৬২ ভোট। রাঙামাটি আসনে ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন দীপেন দেওয়ান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা পেয়েছে ৩১ হাজার ২২২ ভোট।
গত দেড় বছরে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশে নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। দেশজুড়ে তৌহীদ জনতার নামে মব তৈরি করে হত্যা এবং নির্যাতন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীরা সুফি পীর দরবেশদের উপরে আক্রমণ, মাজার ভাঙা, বাউলদের নিগ্রহ, সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার, সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের উপরে আক্রমণ। মহিলাদের উপরে আক্রমণ। উদীচী, ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপরে আক্রমণ, আগুন দেওয়া– এইরকম অজস্র ঘটনায় মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। এইসব ঘটনার সঙ্গে জামায়াত এবং এনসিপি’র সমর্থকদের একটি অংশের ঘনিষ্ঠতাও সামনে আসে। জামায়াতের পক্ষ থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বদলের চেষ্টা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বদলে দেওয়ার দাবি- বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে। পাশাপাশি, জামায়াতের পক্ষ থেকে স্কুলে শিশুদের গানের শিক্ষা বন্ধ করা, পোশাক নিয়ে ফতোয়া ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়েও মুক্তমনা মানুষ বিপদ গোনেন। ফলে অসাম্প্রদায়িক, মুক্তমনা, বামপন্থী, সম্প্রীতির পক্ষে থাকা মানুষ যাঁরা সাধারণভাবে বিএনপি’র ভোটার নন, তাঁরাও এবার জামায়াতকে রুখতে একজোট হয়ে বিএনপি-কে ভোট দিয়েছেন। এর পাশাপাশি বিএনপি তার পূর্বের অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পরে এই উদ্বেগের জায়গাকেই প্রশমিত করার কাজ করেছেন। তার জেরে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক অংশের পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের বিশাল অংশের ভোট সরাসরি বিএনপিতে যাওয়ার জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে এই বড় জয় তারা পেয়েছে।
Jamaat Bangladesh
জামাতকে রুখে দিলেন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষ
×
Comments :0