অরিজিৎ মণ্ডল
বাজেটের বরাদ্দ খরচ না করে ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করল কলকাতা কর্পোরেশন। জল সরবরাহ থেকে জঞ্জালের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বরাদ্দ টাকা খরচ করা হয়নি।
শুক্রবার কলকাতা কর্পোরেশনের বাজেট পেশ হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বাজেটে মোট বরাদ্দ ৫ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা দেখানো হলেও কর্পোরেশন খরচ করেছে ৪ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৫ হাজার ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে বাজেটে ঘাটতি ১১১ কোটি টাকা হবে বলে অনুমান করেছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। এবার ঘাটতি দাঁড়াবে ১২২ কোটি টাকায়। গত বাজেটে ঘাটতি ১১৪ কোটি টাকা ঘাটতির অনুমান।
বাজেটে দেখা যাচ্ছে একাধিক খাতে গত বছর যা বরাদ্দ হয়েছিল তার বেশির ভাগটাই খরচ করা যায়নি। গত বাজেটে জল সরবরাহের বরাদ্দ ছিল ৪৫৪ কোটি ৯০ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু খরচ হবে অনেক কম, ২৪১ কোটি ৪৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। এবার বরাদ্দ ৪৫৬ কোটি ৮৯ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮০ কোটি ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু খরচ হচ্ছে ১২৬ কোটি ৭৭ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ১৮৩ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ আগেরবারের থেকে মাত্র ৩ কোটি ৪৯ লক্ষ বেশি।
এদিন যে বাজেট পেশ করা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে জঞ্জাল বিভাগের খাতে। ২০২৫ ২৬ অর্থবর্ষে এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৬৮৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা। কিন্তু খরচ করা হয়েছে ৫৬১ কোটি ১৮ লক্ষ ৮২ হাজার টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে জন্য জঞ্জাল বিভাগের খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯০ কোটি ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।
এছাড়াও প্রশাসনিক কাজে সহায়তা বা ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড সাপোর্ট’ বলে একটি নতুন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। এই খাতে আগে বরাদ্দ ছিল না। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৩৭ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু এই খাত ঠিক কেন, এত টাকা বরাদ্দ কেন, বাজেট বক্তৃতায় জানাননি মেয়র।
কলকাতা কর্পোরেশন বরাদ্দ টাকা খরচ না করতে পারলেও কাউন্সলিররা হামেশাই বড় বড় গাড়ি চড়ে ঘোরেন!
কলকাতা কর্পোরেশনের প্রাক্তন মেয়র আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, "কর্পোরেশনের মৌলিক কাজের জন্য গত বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল সেই অর্থই খরচ করতে পারেনি কর্পোরেশন। এর থেকেই প্রমাণ হয় কর্পোরেশন তার মৌলিক কাজ করতে ব্যর্থ। তারা প্রশাসনিক ও অন্যান্য বলে একটি খাতে টাকা বরাদ্দ করেছে, তার হয়তো মূল লক্ষ্য প্রচারে টাকা ব্যবহার করা এবং হয়তো অন্য কিছু পরিকল্পনাও থাকতে পারে। কিন্তু তা কর্পোরেশনের মৌলিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। রাজ্য সরকার যেমন দেউলিয়া হয়ে পড়েছে কলকাতা কর্পোরেশনও সেই পথেই যাচ্ছে। তাদের নিজস্ব যে দায়িত্ব তা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।"
কলকাতা কর্পোরেশনের বাম পরিষদীয় দলনেতা মধুছন্দা দেব এদিন বাজেট পেশের পর বলেছেন, "যদি বাজেটের সব খাতে সঠিক বরাদ্দের টাকা খরচ করা হতো তাহলে পরিষেবা বাড়তে পারত। ১০০ দিনের কর্মীদের সঠিক সময় বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। টাকা খরচ হচ্ছে না, তা’হলে বেতন দেওয়া যাচ্ছে না কেন? কলকাতা কর্পোরেশন দীর্ঘ সময় কলকাতার বেকার যুবদের কর্মসংস্থানের জন্য স্থায়ী নিয়োগ করেছে। কিন্তু বর্তমানে বহু শূন্যপদ থাকলেও সেখানে স্থায়ী নিয়োগ হচ্ছে না। বেকার যুবদের স্থায়ী নিয়োগের ব্যাপারে কর্পোরেশনের একটি দায়ভার আছে। তা কর্পোরেশন কেন পালন করছে না এই প্রশ্ন আমরা আলোচনায় তুলব।"
এদিন বাজেট পেশের পর টক টু মেয়র করেন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তারপর সাংবাদিক সম্মেলনে যা ব্যয় বরাদ্দ তা খরচ হয়নি সেই বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে এদিন ফিরহাদ বলেন, "আমাদের যা আয় সেখান থেকে খরচা করিনি। কিন্তু সরকারের গ্রান্টে অনেক বেশি টাকা খরচা হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।"
বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, "মৌলিক কাজ যেমন বস্তি উন্নয়ন, কর্পোরেশন স্কুল, প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, জঞ্জাল পরিষ্কার, পরিপ্রণালী পরিষ্কার, ড্রেনেজ পরিষ্কার, সেই কাজগুলোই তারা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ টাকা খরচই করতে পারছে না। যারা প্রায় কুড়ি বছর কলকাতা কর্পোরেশন চালাচ্ছেন তাহলে তারা কেন করতে পারছেন না এর ব্যাখ্যা কোথায়?
কলকাতা কর্পোরেশনে প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি শূন্যপদ রয়েছে। কিন্তু বাজেটে পেশ করার সময় এই বিষয়ে কোনও কথাই বলেননি মেয়র। বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, কলকাতা কর্পোরেশন কোনও স্থায়ী নিয়োগ করবে না। এটাই এখন ওদের নীতি। স্থায়ী নিয়োগ করতে গেলে যে দায়ভার নিতে হয় সামাজিকভাবে তা নেওয়ার ক্ষমতা কর্পোরেশনের নেই। স্থায়ী পদ ফাঁকা রেখে অস্থায়ী শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো যায় না্
কলকাতা কর্পোরেশনের সিপিআই(এম) কাউন্সিলর নন্দিতা রায় বলেছেন, "বাজেটে যা বরাদ্দ হয়েছিল তা বহু ক্ষেত্রে ৬০-৭০ শতাংশের বেশি খরচ করা যায়নি। আগামী দু'দিন বাজেটের উপর যে আলোচনা হবে তাতে আমরা প্রশ্ন করব কেন তা করা গেল না। তিনি বলেন, "সঠিক বরাদ্দ সঠিক খাতে হচ্ছে না। যেখানে বরাদ্দ হচ্ছে সেখানে কাজ হচ্ছে না।’’
Comments :0