নতুনপাতা
মণ্ডা মিঠাই
নাগাসাকির ছবিতে আমার মেয়ের মুখ
সৌরভ দত্ত
৯ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
স্কুলে আমার নিজস্ব একটা আমার ড্রয়ার রয়েছে । সেখানে অনেক জিনিস থাকে।বাংলার সাতপাঁচ।ওতে টেরাকোটা একটা বুদ্ধ মূর্তি রাখা থাকে সর্বদা।এর একটাই কারণ, একটাই জীবনের কঠিনতম যুদ্ধে--"বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি..." এই শ্লোক আবর্তিত হয়।জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছে জাপানের ওই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দুটো শহর !
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্ল্যাটমান এসেছিল শেষ করে দিয়ে গিয়েছিল স্বপ্ন সাম্পান নাগাসাকিকে।এই পরমাণু বোমায় বিধ্বস্ত ৭৪০০০ মানুষের মধ্যে অনেক শিশু ছিল। প্রত্যেকের চোখেই ছিল স্বপ্নের সুলুক সন্ধান।
আমার মেয়ের মুখ মনে পড়ে ।ও আজ ম্যামকে বলেছে আমাকে নাগাসাকি দিবসের ছবি আঁকান।নচেৎ আঁকব না । আমার সেই ছোট্ট বাচ্চাটাও আজ প্রতিবাদ করতে শিখে গেছে।যে কোনো ছবি সময়ের দর্পণ।আজ ,২০২৬ এ দাঁড়িয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি হচ্ছে নাগাসাকিকে ঘিরে।
আজ অনেকক্ষণ ছিলাম এক আয়োজক সংস্থার শ্রাবণ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানে সেখানেও রবি স্মরণের পাশাপাশি নাগাসাকির ভয়াবহতার কথা উঠে এল। এর থেকে বোঝা যায় মানুষ ইতিহাস বিস্মৃত হয়নি এখনো।পরমাণু বোমা শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। ইতিহাস বলে ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট সকালে, কর্নেল পল টিবেটসের চালনায় এনোলা গে নামের একটি আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমান টিনিয়ান দ্বীপ থেকে উড়িয়ে দেয়। এর পেটের ভেতরে ‘লিটল বয়’ নামে পরিচিত একটি ইউরেনিয়াম-২৩৫ গান-টাইপ ফিশন বোমা ছিল।
স্থানীয় সময় ঠিক সকাল ৮:১৫ মিনিটে হিরোশিমার কেন্দ্রস্থলে লিটল বয় বোমাটি ফেলা হয়। সেসময় তোমাসিকো নামের মেয়েটা তৈরি হচ্ছিল স্কুলে যাবে বলে । পরমাণুর পুঞ্জীভূত মেঘ সেদিন গোটা জাপানের মূল কেন্দ্রকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল।শহর থেকে প্রায় ১,৮০০ ফুট উপরে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়, যার ফলে একটি বিশাল অগ্নিগোলক ও অভিঘাত তরঙ্গ সৃষ্টি হয় যা পুরো শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ ধ্বংস করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ বলেন--"হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী..."।
কিন্তু একটা বাচ্চার আর্তনাদ কোয়েটা নামক মেয়েটার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন আঙ্গুল যে তাপদগ্ধ কিন্তু সোচ্চার কন্ঠে বলতে চাইছিল যুদ্ধ নয় শান্তি চাই...
আজও হিরোসিমা-নাগাসাকি আসে চোখের সামনে ভেসে ওঠে জাপানের রক্তনদী ।বোমাটি ছিল গোলাকার প্লুটোনাম ক্ষেপণাস্ত্র। নাগাসাকি শহরে ৯ আগস্ট বেলা ১১টা ২ মিনিটে বোমাটি মাটি থেকে ৫০০ মিটার উপরে বিস্ফোরিত হয়। নিমেষে ঝরে গিয়েছিল প্রায় এক লক্ষ ৪০ হাজার প্রাণ। বোমার তেজস্ক্রিয়তায় শিশুদের মাথার চুল পর্যন্ত উঠে যায় ৷ শিশুরা খাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে৷ আর বোমার আঘাতে আহতরা দীর্ঘদিন কষ্ট ভূগতে ভূগতে এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৷ ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখে পৌঁছে যায় ৷
আজ ঘরোয়া আড্ডায় প্রসঙ্গ ক্রমে একজন নব প্রজন্মের ছেলেকে বলছিলাম সে সব করাল ভয়ংকর দিনের কথা।কেন প্রতি বছর ওই ঘটনাকে স্মরণ করে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকি দিবস।
হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবস উপলক্ষে একটাই আশা-- পৃথিবী থেকে সকল পরমাণু বোমা ধ্বংস করা হোক। নষ্ট হোক শাসকের তেজস্ক্রিয় আঘাত,নিশ্চিত হোক বারুদের গন্ধমুক্ত সুন্দর পৃথিবী, সবাই সুস্থভাবে থাকবে,যেখানে নতুন প্রজন্মের জন্য থাকবে নিশ্চিত নিঃশ্বাস এবং সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
একজন সমাজকর্মী হিসাবে দগ্ধ সময়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার পঙক্তি মনে পড়ে--"জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
চ’লে যেতে হবে আমাদের।
চ’লে যাবে—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবাে জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"
যুদ্ধবাজ পৃথিবীতে বারংবার বাঁচার রসদ জোগায় মানবতার বৌদ্ধিক উচ্চারণ। বামিয়ানে তালিবানিরা ভেঙে চুরমার করে দিলেও আমার, আমাদের স্বপ্নে বুদ্ধ আসেন বারবার,বুদ্ধ হাসেন...আজ সন্ধ্যায় শেষ পযর্ন্ত একটা ছবি এঁকেছে মেয়েটা। যুদ্ধের অযুত ক্ষত নিয়ে হুইল চেয়ারে ঘাড় কাত করে নতুন পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছেন এক জাপানি বৃদ্ধা রমণী...
Comments :0