NATUNPATA | STORY | DHI BANDHU | SUKANTA MANDOL | 10 OCTOBER 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | গল্প | দুই বন্ধুর দেখা | সৌরীশ মিশ্র | ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  STORY  DHI BANDHU  SUKANTA MANDOL  10 OCTOBER 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

গল্প 

দুই বন্ধুর দেখা

সুকান্ত মন্ডল 

১০ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
 

এক বৈশাখের বিকেলে ধুলো উড়িয়ে এক পথিক হেঁটে যাচ্ছিল এক জনমানবহীন শুকনো পথ দিয়ে। ধুলোর চাদরে ঢাকা সেই পথেই হঠাৎ তার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল আর এক পথিকের সাথে।

প্রথমজন শীর্ণ, অবসন্ন, চোখ দুটো তার শূন্য। অন্যজনের পুরো শরীর রুক্ষ, ধূসর বালুকণায় মোড়া।

প্রথম পথিক থমকে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রূপটা দেখেও যেন চিনতে পারছিল না সে। কিন্তু নোনা বাতাসের সেই গন্ধ তো ভুল হওয়ার নয়! অবাক হয়ে সে বলল, “তুই? সমুদ্র না তুই? তোর এই দশা কেন ভাই? তোর সেই উত্তাল রূপ, নীল জলরাশি... সব কোথায় গেল?”

মরুভূমি এক লম্বা শ্বাস ফেলল। বুক ফেটে যেন এক শুকনো হাওয়া বয়ে গেল। সে মৃদু হেসে বলল, “সমুদ্র নামটা আজ আর নেই রে ভাই, মানুষ এখন আমাকে ‘মরুভূমি’ বলে ডাকে। আর তুই? তুই তো মানুষের চোখের কোণে পরম সুখে বাস করতিস, আজ এমন ভবঘুরের মতো ধুলোমাখা রাস্তায় কেন?”

অশ্রু রাস্তার পাশে একটা শুকনো পাথরের ওপর বসল। চোখ দুটো দূর দিগন্তে রেখে বলল, “আর বলিস না। যার চোখে আমি ছিলাম, সে মানুষটা বড় কষ্টে ছিল রে। প্রথমে যখনই তার বুকে দুঃখ আসত, আমি অমল ধারায় ঝরে পড়ে তার মনটা হালকা করে দিতাম। কিন্তু দুঃখ পেতে পেতে একসময় তার চোখের সব জল শুকিয়ে গেল। গভীর রাতে যখন সে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকত, আমি আর বেরোতে পারতাম না। তখন বুঝলাম, আমার এই বাইরে বেরোনোর দিন শেষ। যে জল চোখে দেখা যায় না, সে জল তখন ঝরতে শুরু করেছে তার হৃদয়ের গভীরে। চোখ দুটোকে খালি আর শুকনো রেখে, তার আসল কষ্টটাকে বুকের ভেতর গোপন করে দেওয়ার জন্যই আমি তার শরীর ছেড়ে এই রাস্তায় বেরিয়ে এলাম।”

মরুভূমি চুপ করে সব শুনল। তার পর সে বলল, “তোর আর আমার পরিণতি আলাদা কিছু নয় রে অশ্রু। চোখের জলও নোনা, আর আমার বুকের জলও নোনা ছিল। প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়মে আর রোদের নিষ্ঠুর তাপে বছরের পর বছর ধরে আমার বুকের জল উবে যেতে লাগল। সবাই ভাবল সমুদ্র মরে গেল। কিন্তু আমি মরে যাইনি, আমি মরুভূমি হয়ে রূপ বদলালাম। আজও মাঝরাতে যখন বাতাস আমার বুকের ওপর দিয়ে সোঁ সোঁ করে বয়ে যায়, লোকজন থমকে দাঁড়ায়। আমার বুকে জলরাশি দেখা না গেলেও, বাতাসের সেই গর্জনে মানুষের মনে আজও আমার সেই পুরনো সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে। আমরা দুজনই নিজেদের রূপ বিসর্জন দিয়েছি, শুধু অন্যের বুকে আমাদের স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রাখতে।”

ধুলো-ওড়ানো রাস্তার মধ্যে দুই নোনা জলের বন্ধু তখন কী বলবে আর কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছে না। কারও মুখেই আর কোনো সাড়া নেই। তার পর অশ্রু বলল, “আচ্ছা ভাই, এবার আসি তাহলে।”

সূর্য ডুবুডুবু। অশ্রু আর মরুভূমি আবার যার যার পথে হাঁটতে শুরু করল। তারা জানে, মানুষ তাদের শুষ্কতা দেখেই বিচার করবে, কিন্তু তাদের এই রূপবদলের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মহৎ আত্মত্যাগের ইতিহাস।

 

Comments :0

Login to leave a comment