সঞ্চারী চট্টোপাধ্যায়: হায়দরাবাদ,
খালি পায়ে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে এসেছেন আয়াম্মা। কোনও রকমে নামটুকু বললেন, বয়স আশি ছুঁইছুঁই। ব্যারিকেডের কোণে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন সোজা। মঞ্চে তখন বলছেন বৃন্দা কারাত, ‘হিন্দু হোক বা মুসলিম, রক্ত-ঘাম সবারই তো এক।’ হিন্দি-ইংরেজিতে ভাষণ বুঝতে পারছেন না আয়াম্মা, তেলুগুতে অনুবাদ শুনেই হাত মুঠো করে ধরছেন আকাশের দিকে।
আয়াম্মার মতো শয়ে শয়ে মহিলা রবিবার ভিড় জমিয়েছিলেন আরটিসি বাস গ্রাউন্ডে। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে তাঁরা প্রথমে আসেন সম্মেলন স্থলে। সেখান থেকে আরটিসি রোড ধরে ময়দানে মিছিল করে যান। সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির সর্বভারতীয় সম্মেলন উপলক্ষে এদিন ছিল প্রকাশ্য সমাবেশ। নানা ধরনের বাদ্যি বাজিয়ে নেতৃবৃন্দকে অভ্যর্থনা জানান স্থানীয়রা। সঙ্ঘ-বিজেপি’র বিপদ, মহিলাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত, মোদী সরকারের জনবিরোধী নীতি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করে দেওয়া সমস্ত বিষয় উঠে এসেছে নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে। বর্ষীয়ান নেত্রী বৃন্দা কারাত বলেন, ‘‘কাল ২৬ জানুয়ারি, সাধারণতন্ত্র দিবস। ইন্ডিয়া গেটের সামনে নরেন্দ্র মোদী সেলাম ঠুকবেন। কিন্তু এই সেলাম সংবিধানের জন্য নয়, এই সেলাম আরএসএস’কে দেবেন তিনি। কারণ এঁরা সংবিধান মানে না। নারী মুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা, বড় বিপদ সঙ্ঘ-বিজেপি। সংবিধান একতার জন্য, অধিকারের জন্য, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য। সংবিধানের উপর বুলডোজার চালানো মানে কয়েকটা কাগজ ছিঁড়ে ফেলা নয়, আমাদের অধিকার ধ্বংস করে দেওয়া। সর্বক্ষণ ধর্মের নামে ভেদাভেদ চলছে। শ্রমজীবী মহিলারা যখন কাজে যান, তখন কি হিন্দু বলে মালিক পয়সা বেশি দেয়? অথচ মহিলাদের মধ্যেই ধর্মের নামে বিভাজন সব থেকে বেশি করা হচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে হাতিয়ার করে তুলেছে ওরা। ইনসানিয়াতের হত্যার বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতেই হবে।’’
মাইক্রোফিনান্স সংস্থাগুলির ভয়াবহ চেহারা তুলে ধরে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদিকা মারিয়ম ধাওয়ালে বলেন, ‘‘মোদীরাজে মানুষের হাতে কাজ নেই। মহিলারা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। হাতে কাজ না থাকলে আয় হবে না। সংসার কেমন করে চলবে? জীবন চলবে কীভাবে? তখনই চিলের মতো মাইক্রোফিনান্স সংস্থাগুলি রক্ত চুষতে চলে আসে। বিরাট সুদে টাকা ধার দেয় গ্রামীণ গরিব মহিলাদের। রোজগার না থাকায় সেই টাকা তাঁরা শোধ করতে পারেন না। ফলে তখনই তাঁদের উপর কোপ পড়ে। থালা বাসন পর্যন্ত নিয়ে চলে যায়। মহিলারা এমএফআই’র ফাঁদে পড়ে আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হন। আমরা ব্যাঙ্কে যে টাকা রাখি, মোদী সরকার সেখান থেকেই এমএফআই কোম্পানিগুলিকে অল্প সুদে টাকা ধার দেয়। আর ওই কোম্পানিগুলি চার গুণ সুদ বসিয়ে মহিলাদের ফাঁদে ফেলে। প্রতিদিন মহিলাদের উপর হিংসা বাড়ছে। দেশ আমাদের, সংবিধান আমাদের। ধর্ম-জাতপাতের রাজনীতি থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে প্রত্যেক নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।’’
‘‘ভারত এখন মহিলাদের জন্য সব থেকে অসুরক্ষিত দেশ’, মোদী সরকারের কড়া সমালোচনা করেন সংগঠনের সর্বভারতীয় সভানেত্রী পি কে শ্রীমতি। তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে যে অধিকার আমরা অর্জন করেছি, তা ছিনিয়ে নেওয়ার ছক চলছে। এখন মেয়েরা অনেকাংশে প্রাথমিক শিক্ষাটকুও পান না। ডবল ইঞ্জিন নিয়ে প্রচুর প্রচার চলে বিজেপি’র। ওই রাজ্যগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বিজেপি সরকারের ‘দৌলতে’ মহিলাদের কী হাল। বিজেপি’র জনবিরোধী নীতি এবং বিকল্প হিসাবে কেরালা মডেলের কথা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, গত তিন বছরে আমরা দেশজুড়ে বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছি। এই সম্মেলনে সে সমস্ত সংঘর্ষের কথা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন প্রতিনিধিরা। এই সম্মেলন থেকেও আমরা পরবর্তী আন্দোলনের রসদ নিয়ে এগিয়ে যাব।
সংগঠনের সহ সভাপতি সুভাষিনি আলি বলেন, ‘‘মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, ত্রিপুরা, সর্বত্র মহিলারা লড়ছেন বিজেপি’র বিরুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী রাজ চলছে। সেখানে তৃণমূলের সরকার। সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে মহিলাদের লড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি আর জি কর আন্দোলনে মহিলারা কী শক্তিশালী ভূমিকা নিয়েছে আমরা তা দেখেছি। আমি উত্তর প্রদেশে থাকি। ওখানে বিজেপি বলে নেতা হলে যোগীর মতো হও। আর কেরালায় গিয়ে মোদী বলে, কেরালাকে উত্তর প্রদেশ মডেল বানাবো। কী বানাবে? হাসপাতাল থাকবে না, অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাবে না, রাস্তার মধ্যে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মা প্রাণ হারাবে? বিজেপি মানেই দলিত, মহিলাদের সর্বনাশ। ভেনেজুয়েলা, গাজার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের চৌকিদার তো আমেরিকার পিছে। যে দেশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এতকাল লড়েছে, আজ সেই দেশ সাম্রাজ্যবাদে সমর্থন জোগাচ্ছে। কিন্তু আমরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ভুলব না।’’ এদিন বক্তব্য রেখেছেন সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ পূণ্যবতী, তেলেঙ্গানার প্রাক্তন বিধায়ক রঙ্গারেড্ডি।
প্রকাশ্য সমাবেশের পর এদিনই শুরু হয়েছে প্রতিনিধি অধিবেশন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর খসড়া রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন মারিয়ম ধাওয়ালে। তিনি বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী শক্তির আধিপত্য বিস্তার এবং তার মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা করেন। বলেন, ‘‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বলতে কি বোঝায়, তার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষ সহজে বুঝে উঠতে পারেন না। তাই সাবলীল ভাষায় এ বিষয়ে লাগাতার চর্চা করা দরকার।’’ নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের আমলে দেশের ভয়ংকর অবস্থা ব্যাখা করে তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ গরিব থেকে আরও গরিব হয়ে যাচ্ছেন। সংবিধানের উপর লাগাতার হামলা হচ্ছে। ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর মোদী সরকারের বিরোধিতা করলেই দেশদ্রোহী তকমা দেওয়া হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনার লক্ষ্যে আলোচনা চলবে।’’
প্রতিনিধি অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী তৈরি হয়েছে পিকে শ্রীমতী, জেসমিন সুলতানা, ভি প্রমীলা, ঊষা সরোহা, মোনালিসা সিনহা, সুনীতা সিংঘে, অরুণা জ্যোতিকে নিয়ে। সভাপতিমণ্ডলীর কনভেনর পিকে শ্রীমতী। পাঁচ সদস্যের মিনিটস কমিটি এবং পাঁচ সদস্যের ক্রেডেন্সিয়াল কমিটি তৈরি হয়েছে। পাঁচ সদস্যের রেজোলিউশন কমিটি তৈরি হয়েছে। কনভেনর কনীনিকা ঘোষ, কমিটিতে রয়েছেন ঈশিতা মুখার্জি। এদিন গাজা গণহত্যার প্রতিবাদে প্রস্তাব পেশ করেছেন সংগঠনের প্রাক্তন সভানেত্রী মালিনী ভট্টাচার্য।
Comments :0