মার্কিন রাজনীতিতে বড়সড় পালাবদলের ইঙ্গিত। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের একের পর এক আসন ছিনিয়ে নিয়ে সেনেটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো ডেমোক্র্যাটরা। অন্তত ছ'টি রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলকে বড়সড় ধাক্কা দিল তারা। শুধু সেনেট নয়, প্রতিনিধি সভা বা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা দখলের পথে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের নীতি এবং তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভই এই নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কানসাস, টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলিনার মতো রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যেও এবার ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দশক পর এই রাজ্যগুলিতে ডেমোক্র্যাট সেনেটর নির্বাচিত হলেন। কানসাসে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে হারিয়ে অপ্রত্যাশিত জয় ছিনিয়ে নেন মেথডিস্ট চার্চের যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন। প্রায় ৯৪ বছর পর এই রাজ্যে সেনেটের আসন দখল করল ডেমোক্র্যাটরা। একইভাবে ওহাইও ও আইওয়ার মতো রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও এবার ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য নজর কেড়েছে।
প্রতিনিধি সভাতেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক ফিগার ২১৮-এর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ইতিমধ্যেই ২০টিরও বেশি রাজ্যে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। বর্তমানে যেসব আসনে এগিয়ে রয়েছে, সেগুলিতে জয় ধরে রাখতে পারলে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে লাগামছাড়া জীবনযাত্রার খরচ, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব। নির্বাচনী ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আগামী দু'বছর অত্যন্ত কঠিন করে তুলতে পারে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের একাধিক আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে বিরোধীরা। পাশাপাশি প্রশাসনের বিরুদ্ধে শুনানি, সমন জারি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের পথও খুলে যাবে। যদিও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং সেনেটে ফিলিবাস্টার প্রক্রিয়ার কারণে ডেমোক্র্যাটদের পথ পুরোপুরি মসৃণ হবে না।
ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের শুরু হয় নর্থ ক্যারোলিনা থেকে। সেখানে সেনেট ও প্রতিনিধি সভা, দুই ক্ষেত্রেই রিপাবলিকানদের পরাজিত করেছে তারা। রিপাবলিকান নেতা চাক এডওয়ার্ডসের অবসরের পর তার আসনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমি এজার। অন্যদিকে সেনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন রয় কুপার। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম নর্থ ক্যারোলিনার সেনেট আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে এল।
নিউ জার্সিতেও প্রতিনিধি সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রাক্তন নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলট রেবেকা বেনেট হারিয়েছেন দু'বারের রিপাবলিকান সাংসদ টম কিন জুনিয়রকে। গত দুই মধ্যবর্তী নির্বাচনেই এই আসনের হাতবদল হওয়ায় এবারের লড়াই ছিল যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
পেনসিলভানিয়াতেও বড়সড় সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকান সাংসদ রায়ান ম্যাকেঞ্জিকে পরাজিত করেছেন বব ব্রুকস। শ্রমজীবী পরিবারের পটভূমি এবং নিজের শ্রমিক পরিচয়কে প্রচারের হাতিয়ার করেছিলেন তিনি। সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার খরচ এবং আর্থিক সমস্যাকে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু করে তোলেন ব্রুকস।
সাউথ ক্যারোলিনা ও টেক্সাসেও সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাউথ ক্যারোলিনায় ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়েছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। অন্যদিকে টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে সেনেটের আসন দখল করেছেন জেমস টালারিকো।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু সেনেটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গভর্নর নির্বাচনেও বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন জিনা হিনোজোসা। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন। একই সঙ্গে রাজ্যের প্রথম লাতিনা মহিলা গভর্নর হওয়ার নজির গড়লেন হিনোজোসা। ২০১৪ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর এবার চতুর্থবারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে লড়ছিলেন অ্যাবট।
গভর্নর নির্বাচনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল সামনে এসেছে। ওহাইওতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাকশন। তার জন্মদাত্রী মাকে ঘিরে বিজ্ঞাপন বিতর্কও শেষ পর্যন্ত অ্যাকশনের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
আইওয়াতেও ইতিহাস তৈরি হয়েছে। রিপাবলিকান প্রার্থী জ্যাক লনকে হারিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট রব স্যান্ড। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয়, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই রাজ্যে ট্রাম্প ১৩ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
এবারের গভর্নর নির্বাচনেও একাধিক ঐতিহাসিক নজির তৈরি হয়েছে। জর্জিয়ায় রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন কেইশা ল্যান্স বটমস। এর ফলে কোনও মার্কিন অঙ্গরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর হওয়ার নজির গড়লেন তিনি। উইসকনসিনে রিপাবলিকান টম টিফানিকে হারিয়ে গভর্নর হয়েছেন ডেভিড ক্রাউলি। তিনিও রাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর। অন্যদিকে নিউ মেক্সিকোতে জয়ী হয়েছেন ডেব হাল্যান্ড। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও অঙ্গরাজ্যের প্রথম আদিবাসী আমেরিকান মহিলা গভর্নর হিসেবে ইতিহাস তৈরি করলেন তিনি।
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর পরাজয় কার্যত মেনে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের স্বার্থে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে তার দাবি, এবারের নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হত।
সব মিলিয়ে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করল। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকে শুরু করে আইন প্রণয়ন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে তাকে। আমেরিকার রাজনীতিতে এই নীল ঝড় আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণ কতটা বদলে দেয়, এখন সেটাই দেখার।
USA Mid term election
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা ট্রাম্পের, সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ জয়
×
Comments :0