নতুনপাতা
উৎসব ১৪৩৩
বই
নির্মিত মিথ্যার জবাবে : স্বর্ণেন্দু দত্ত
২৭ অক্টোবর ২০২৬ — ৪র্থ বর্ষ
“গান্ধীজী দেশকে ঠকিয়ে দেশকে টুকরো করেছেন। যেহেতু এইরকম আদালত বা আইন নেই, যার ভিত্তিতে এই অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, তাই আমি গান্ধীজীকে গুলি করেছি। ওঁকে শাস্তি দেওয়ার কেবল এই একটিই পদ্ধতি অবশিষ্ট ছিল।”গান্ধী হত্যার বিচারের সময় এমন দাবি করেছিল নাথুরাম গডসে। তার দীর্ঘ জবানবন্দী, যা বই আকারে প্রকাশ করা হয় নানা ভাষায়। গান্ধী হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত নাথুরাম গডসের ভাই গোপাল গডসে ১৫ বছর পরে জেল থেকে বেরিয়ে নাথুরামের জবানবন্দী ভিত্তিক বই লেখে, ‘গান্ধী বধ কিউ?’ নজর করার মতো বিষয় হলো ‘বধ’ শব্দটি। ‘ম্যায়নে গান্ধী কে কিউ মারা?’ এই শিরোনামে নাথুরাম গডসের নামে বড় প্রকাশনা থেকেও হিন্দিতে বই পাওয়া যায়। কিন্তু ‘বধ’ শব্দটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বাংলায় ড. নীরদবরণ হাজরা ভাষান্তর করেছিলেন ‘শুনুন ধর্মাবতার’ নাম দিয়ে।
নাম যাই হোক, মূল লক্ষ্য নাথুরাম গডসের গান্ধী-হত্যার যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করা। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদীদের গায়ে যে কলঙ্ক লেগেছে, তার দাগ ধুতে গডসের কাজকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা। এই কাজ অস্বাভাবিক গতি পেয়েছে ২০১৪সালে দেশে নতুন সরকার আসার পরে। রাষ্ট্রনেতারা দেশ-বিদেশে গান্ধীর ছবির সামনে নতশির হচ্ছেন ঠিকই কিন্তু গান্ধী সম্পর্কে বেলাগাম মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য উপস্থিত করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে। সোশাল মিডিয়া এই বইগুলির থেকেও আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে সাম্প্রতিক সময়ে।
এইরকম প্রেক্ষাপটেই গবেষক লেখক সাম্য বসু ‘গান্ধী হত্যা কেন? নাথুরাম গডসের জবানবন্দীর প্রত্যুত্তর’ বইতে গডসের অভিযোগগুলি এবং ইতিহাসের তথ্যের আলোকে তার সত্যতা বিচার করেছেন। নাথুরাম তাঁর অভিযোগে গান্ধীজীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই মুসলিম তোষণ এবং হিন্দু স্বার্থের ক্ষতির অভিযোগ এনেছেন। অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলন, পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, দেশভাগ, সদ্যগঠিত পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্য ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলিম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন এবং তার জন্য গান্ধীকে দায়ী করছেন। এমনকি কোনও তথ্য ছাড়াই গান্ধীর কারণেই হিন্দুদের ধর্মান্তরণ, হিন্দু নারীদের ধর্ষণ বৃদ্ধি, মন্দির অপবিত্র হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সৌম্য বসু তৎকালীন ঘটনাক্রম এবং তথ্য পরিসংখ্যান হাজির করে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখিয়েছেন এই অভিযোগগুলির কোনও সারবত্তা নেই। যেমন, খিলাফত আন্দোলনের সমর্থনে হিন্দু মহাসভার স্বামী শ্রদ্ধানন্দ দিল্লির জামা মসজিদে বক্তৃতা করেছিলেন। লোকমান্য তিলক, লালা লাজপত রায় প্রমুখ যাদের এখন হিন্দুত্ববাদীরা স্বীকৃতি দিতে চায় হিন্দু নেতা বলে, তাঁরাও প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। এইরকম প্রতিটি অভিযোগ সম্পর্কেই জবাব পাঠক পাবেন বইটি পড়লে।
সৌম্যর বইটির সূত্রে নতুন করে নাথুরামের জবানবন্দী পাঠেরও সুযোগ এসে যায়। এবং সেখানেই চমৎকৃত হতে হয়, ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে নাথুরাম যা বলেছিল আদালতে দাঁড়িয়ে সেইরকম অনেক বিষয় এখনও সমান গুরুত্ব দিয়ে বা তার থেকেও বেশি জোরের সঙ্গে দেশজুড়ে বিভাজন বিদ্বেষকে জোরালো করতে তুলে ধরা হচ্ছে। যেমন, বন্দেমাতরম। নাথুরামের রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা এখন বন্দেমাতরমের দুটি স্তবক গাওয়ার জন্য কংগ্রেস এবং নেহরুকে যা যা বলে কাঠগড়ায় তুলছে, সেই একই কথা তখন গান্ধীর বিরুদ্ধে বলছিল গডসে। গোহত্যা, হিন্দি ভাষা নিয়েও সেই একই প্রচার। সুভাষচন্দ্র, ভগৎ সিং সম্পর্কে গান্ধীকে নিয়ে যে প্রচার করা হয়, সেই সবই গডসে কথনের পুনরাবৃত্তিই চলছে। পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, দেশভাগ, দাঙ্গা, পাকিস্তান গঠন- সেই সূত্রে মুসলিম তোষণ নিয়ে গান্ধী বা কংগ্রেস নিয়ে গডসে যে অভিযোগ এনেছিল তাই এখনও বলে চলেছে শাসক গোষ্ঠী।
নাথুরামের জবানবন্দী থেকে স্পষ্ট হয়, গান্ধী বা সমসাময়িক অনেক বিষয় নিয়েই তার জানা বোঝায় ভুল ছিল। আসলে যে মতাদর্শে লালিত হয়ে নাথুরাম গান্ধীকে এমন অপরাধী মনে করেছিল, যাঁকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার কমে কিছু করা যায় না- সেই আদর্শকে উপলব্ধি করা জরুরি। ঘটনাক্রমে আমরা জানি, তার আগেই গান্ধীকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। কারা করেছিল, সেটাও সবার জানা। সদ্য স্বাধীন দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির একটি চিঠির জবাবে সুস্পষ্টভাবে লিখেছিলেন, আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার কার্যকলাপের জন্যই দেশে যে সাম্প্রদায়িক ও বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়,তার জেরেই গান্ধীজীকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে তিনি আরএসএস’র কার্যকলাপকে রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গুরুতর বিপদের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন। যে বিষাক্ত মতাদর্শ যেভাবে নাথুরামকে তৈরি করেছিল, তা আজকেও নানা প্রান্তে অনেক নাথুরামকে তৈরি করছে। যারা গান্ধীর আদর্শকে ধ্বংস করতে বেপরোয়া। সেই আদর্শের উত্তরসূরিদের নিকেশ করতে মরিয়া। ‘গান্ধী হত্যা কেন? নাথুরাম গডসের জবানবন্দীর প্রত্যুত্তর’ বইটির পাঠ সেই ঘৃণার মনস্তত্ত্বকে বোঝার জন্যও জরুরি। সৌম্য বসুর গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুধু অতীত চর্চা নয়, বর্তমানকেও বুঝতে সাহায্য করে।
গান্ধী হত্যা কেন? নাথুরাম গডসের জবানবন্দীর প্রত্যুত্তর
সৌম্য বসু। প্ল্যাটফর্ম। ১৫০ পৃষ্ঠা। ৩৫০ টাকা।
Comments :0