এরাজ্যের একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুল হলো হিন্দু স্কুল। রাজ্য সরকারের সরাসরি অধীনস্ত যে ৩৯টি সরকারি স্কুল আছে হিন্দু স্কুল তার অন্যতম। সম্প্রতি এই স্কুলের অভিভাবকরা গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা নিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলেন শিক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে। তাদের দুঃশ্চিন্তা ঘনীভূত হয়েছিল তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে। যেহারে এবং যে দ্রুততায় শিক্ষকের সংখ্যা কমছে তাতে দু’-এক বছরের মধ্যেই স্কুলে পঠনপাঠন লাটে উঠে যাবে। সরকারি স্কুলেই যখন শিক্ষকের এমন হাল তখন সরকার পোষিত বা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলির অবস্থা কতটা শোচনীয় তা সহজেই অনুমেয়।
হিন্দু স্কুলে শিক্ষক থাকার কথা ৪৬ জন। আছেন ২৮জন। অবসর ও বদলির পর ২০২৭ সালে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ২৩ জনে। তার মধ্যে কিছু বিষয়ে শিক্ষক থাকবে না। কিছু বিষয়ে একজন বা দু’জন শিক্ষক থাকবে। এত কম শিক্ষকের পক্ষে এতগুলো ক্লাসের এতগুলো বিভাগে পড়ানো সম্ভব নয়। তাই ছাত্রদের ভবিষ্যৎ সর্বনাশ হওয়া কার্যত অনিবার্য। উদ্বিগ্ন বাবা-মা তাই ছুটে যান শিক্ষা মন্ত্রীর কাছে। কিন্তু তাদের উদ্বেগ কমার কোনও ঘটনা ঘটেনি, তেমন আশ্বাসও মেলেনি। অগত্যা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-অবস্থানে শামিল অভিভাবক, ছাত্র-ছাত্রী, প্রাক্তনী ও শিক্ষাপ্রেমী মানুষজন।
সমস্যাটা শুধু হিন্দু স্কুলের নয়। রাজ্যের প্রতিটি সরকারি, সরকার পোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলেরই একই অবস্থা। বস্তুত রাজ্যে এমন স্কুলের সংখ্যা হাতে গোনা যাবে যেখানে মোট অনুমোদিত শিক্ষকের অর্ধেক আছে। এমন স্কুলের সংখ্যাও বিস্তর যেখানে একজনও শিক্ষা নেই, থাকলেও একজন বা দু’জন আছে। রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথের বাংলায় আজ এমনই শিক্ষার হাল। মমতা ব্যানার্জির এগিয়ে বাংলায় যখন শিক্ষকের অভাবে স্কুলে লেখাপড়া চুলোয় উঠেছে তখন স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের প্রতি, লেখাপড়ার প্রতি ছেলে-মেয়েদের আকর্ষণ, আগ্রহ কমছে। অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। শিক্ষকের অভাবে ক্লাস বন্ধ হওয়ায় এবং ছেলে-মেয়েরা স্কুলে না আসায় মওকা বুঝে সরকার এক এক করে কম ছাত্র-ছাত্রীর অজুহাতে স্কুল বন্ধ করে দেবার ফরমান জারি করতে থাকে। ইতিমধ্যে খাতায়-কলমে চালু থাকলেও বেশ কয়েক হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে অনেক দিন ধরেই কেউ তালা খোলে না, ছাত্র-ছাত্রীরাও যায় না। এখন সরকার পরিকল্পনা করেছে যে সব স্কুলে কম ছাত্র-ছাত্রী তাদের দু’তিনটি স্কুলকে জুড়ে একটি স্কুল করা হবে। তাতে স্কুলের সংখ্যা আরও কমবে। অর্থাৎ বিদ্যালয় শিক্ষা সম্প্রসারণ নয় সঙ্কোচনই সরকারের নীতি।
বাম জমানায় সরকারের নীতি ছিল প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া। তাই রাজ্যের প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল বাম সরকার। শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী কোনও ছাত্র-ছাত্রীদেই যেন এক কিলোমিটারের বেশি দূরে গিয়ে স্কুলে পড়তে না হয় তার জন্য কাছাকাছি স্কুল বানাতে হবে। সে সব এখন অতীত। এগিয়ে বাংলায় এখন শিক্ষা বিনাশ অভিযান শুরু হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ। নতুন স্কুল তৈরির বদলে চালু স্কুল বন্ধ করা হচ্ছে। স্কুলে পঠন-পাঠন অপেক্ষা ছুটি অগ্রাধিকার। অনবরত পাঠ্যসুচি বদল। যখন তখন নিয়ম পদ্ধতি বদলের তুঘলকি সিদ্ধান্ত। স্কুলগুলিকে কার্যত রূপান্তরিত করা হয়েছে শাসক দলের রাজনৈতিক আখড়ায়। লেখাপড়া ছাড়া বাকি সব সেখানে স্বাগত। চুরি, দুর্নীতির তো কোনও সীমা পরিসীমা নেই। এই সব স্কুলগুলির অভিভাবকরা হিন্দু স্কুলের মতো প্রতিবাদী হয়ে না উঠলে মধ্যযুগে ফেরা ছাড়া উপায় নেই।
Education
শিক্ষা নাশক
×
Comments :0