রণদীপ মিত্র: সিউড়ি
বাড়িতে থাকলে প্রায় প্রতিদিন ফাইল খুলে একবার চোখ বুলিয়ে নেন ৯ ইঞ্চি বাই ৮ ইঞ্চির মার্কশিটটায়। যদিও আজ সেটা নেহাতই এক কাগজের টুকরো। তবু হেদায়তুল্লাহ মাঝে মাঝেই আঁকড়ে ধরেন সেটা, চোখের পাতা ঝাপসা হয়। ঘর ছেড়ে যখন বিঁভুইয়ে পাড়ি দেন, সযত্নে ফাইলবন্দি করে রেখে যান উচ্চমাধ্যমিকের সেই মার্কশিটটা।
মুর্শিদাবাদ সীমান্তের গ্রাম বীরভূমের লম্বাপাড়া। সেই গ্রামেরই বছর তেইশের হেদায়’র রুজির জায়গা হয়ে উঠেছে বাড়ি থেকে দু’হাজার কিলোমিটার দূরের মুম্বাইয়ের জহুরিবাজার। এরাজ্যের এক মেধাবী ছাত্রকে শিক্ষাঙ্গন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার নিদারুণ বাস্তবতার আয়না হেদায়। অনটনের থাবায় তিনি বাধ্য হয়েছেন একুশ বছরেই ‘পরিযায়ী’ হতে। এখন তিনি স্বর্ণ কারিগর। কাগজ-কলমের বদলে তাঁর হাতে উঠেছে সোনার অলঙ্কারের নকশা নিখুঁত করার হেতেল। অথচ তাঁর উচ্চমাধ্যমিকের মার্কশিটে জ্বলজ্বল করছে ৪২৯ নম্বর অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ। স্বপ্ন ছিল আরও পড়বেন। করবেন চাকরি। একদিনের ঝাপটা সব ওলটপালট করে দিয়েছে। আজ তাঁর নজর থাকে ‘এডি’, ‘কুন্দন’ বা ‘হেরিটেজ কুন্দন’র কাজ ক’টা পেলেন সেদিকে। এই হিসেবের সাথেই তো জড়িয়ে রয়েছে তাঁর রোজগারের অঙ্ক।
হেদায় শুনিয়েছেন তাঁর করুণ কাহিনি, ‘‘বাবা পঞ্চায়েতের অ্যাম্বুল্যা ন্স চালাতেন। এক রোগী নিয়ে রামপুরহাট গিয়েছিলেন। সাল ২০২৩। আমি তখন মুরারই কলেজে আর্টস নিয়ে পড়ছি। আচমকা হার্ট অ্যাটাক করে মৃত্যু হয় বাবার। বাবার রোজগারেই দিন চলত আমাদের। বাড়িতে আছেন মা, ভাই। বাবা মারা যাওয়ার পর আরও কয়েক মাস পড়াশুনা চালিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ২০২৪ সালে বাধ্য হলাম সব ছেড়ে রোজগারে নামতে।’’ হেদায় পরিবারের প্রথম প্রজন্ম যিনি উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে পা রেখেছিলেন। কিন্তু টিকে থাকতে পারেননি। তাল কেটেছে পারিবারিক বিপর্যয় এবং এরাজ্যে বেকারত্বের বেহাল দশায়। সোনার অলঙ্কারে পাথর বসিয়ে ‘ডিজাইন’ ও ‘কাটিং’র কাজ হেদায়ের। প্রতি পিসে মেলে কাজের নিরিখে পনেরো থেকে পঁয়তাল্লিশ টাকা। হেদায়ের চিন্তা,‘‘মুম্বাইয়েও কাজ কমছে। আগে দিনে সত্তর-আশি পিস কাজ করতাম। এখন পঞ্চাশ পিস কাজ জোটাতে হিমশিম খেতে হয়।’’ হেদায় এখন আছেন গ্রামেই। ঠিক করেছেন, কাজের ক্ষতি হয় হোক, ভোট দিয়েই ফিরবেন। সাথে শুনিয়েছেন ক্ষোভের কথাও,‘‘আজ রাজ্যে তো নেই, পাওয়া চাকরিও হারাতে হচ্ছে। কি হবে এরাজ্যে থেকে।’’ হেদায়ের ভাই কলেজে পড়ছে। ভাইও উচ্চমাধ্যমিকে ৮০ শতাংশ পেয়েছে। ‘‘ওর পড়া থামতে দেব না’’, জেদ নিয়েছে হেদায়।
রুজির যন্ত্রণায় জেরবারের উদাহরণ শুধু হেদায় নয়। শুধু বীরভূমেই আছে লক্ষাধিক। যন্ত্রণা, কষ্টের আঙ্গিকেরও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। যেমন মুরারইয়ের কাশিমডাঙার নাসিরুদ্দিন ও মুস্তাক হোসেন। দুই ভাই, রাজমিস্ত্রি। রয়েছেন চেন্নাইয়ের পারাপ্পায়। ভোটের আগে বাড়ি ফেরার জন্য হন্যে হয়ে টিকিট খুঁজছেন। স্বজন হারানোর যন্ত্রণা নিয়েই পরিবার ফেলে দুই ভাই আজ ভিনরাজ্যে। মাত্র এগারো মাস হলো তাদের অপর ভাই হাসিরুদ্দিনের হয়েছে মর্মান্তিক মৃত্যু। চেন্নাইয়েই বহুতলে ‘সাটারিং’র কাজ করতে গিয়ে নিচে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। নিজেদের স্ত্রী-সন্তানের পাশাপাশি মৃত ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই কোলের সন্তানেরও ভার রয়েছে নাসিরুদ্দিন ও মুস্তাকের ঘাড়ে।
চেন্নাই থেকে নাসিরুদ্দিন জানিয়েছেন,‘‘জানি, জীবনের দাম নেই আমাদের। কিন্তু কি করব, ঘরে বসে থাকলে তো এতগুলো পেট চলবে না। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো রয়েছে। মন খুব খারাপ করে। কিন্তু ফিরে গেলে তো কাজ পাব না।’’ ভাইয়ের মৃত্যুর পর বাড়িতে এসেছিল প্রধান, মেম্বর, ব্লকের প্রতিনিধি অনেকেই। ‘সমবেদনা’ জানিয়েছেন, সহায়তা নয়। মাস ছয়েক আগে দুই ভাই ছিলেন ওডিশায়। ‘হিন্দুত্ববাদী’দের দৌরাত্ম্যে পালিয়ে এসেছিলেন ভয়ে। মুখ্যমন্ত্রীর ‘পাঁচ হাজারি’ ঘোষণা শুনে পূরণ করেছিলেন ফরম। এক টাকাও পাননি। বীরভূমের শ্রম দপ্তর সূত্রে খবর, বীরভূম জেলায় নথিভুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজারের কিছু বেশি। ক’জন পেয়েছেন অনুদান? এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি একজনকেও। অগত্যা মুস্তাক-নাসিরদের মতো লক্ষাধিকের ঠিকানা হয়েছে সেই ভিনরাজ্যই।
পরিযায়ী মানেই ‘মুসলমান’। পরিযায়ী মানেই ‘বাংলাদেশি যোগ’। সুকৌশলে ছড়ানো এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধেই রয়েছে বাস্তবতা। প্রমাণ রাজনগর ব্লকের মাচানতলি গ্রামের শক্তি মুর্মু। হঠাৎ আসা জ্বর বছরখানেক আগে কেড়ে নিয়েছিল স্বামী অর্জুনের প্রাণ। বাইশ বছরে বিধবা হয়েছেন শক্তি। চালচুলো বলতে নেই কিছু। ছিল পচে যাওয়া খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর। মাটিতে মিশেছে সেটাও। সাত বছরের কোলের সন্তানকে নিজের মায়ের কাছে রেখে বেঙ্গালুরু ছুটেছেন তিনি। শক্তি আজ আদিবাসী মহিলা পরিযায়ী শ্রমিক। কাপড় কলে কাজ করেন। দিনভর খাটুনি খেটে মেলে চারশো টাকা। তা দিয়ে নিজে খান। সন্তানের জন্য পাঠান। শক্তির মা বিজলি সরেন ছলছল চোখে জানান, ‘‘নাতিটোকে নিয়েই আছি। মেয়েটোকে কত দূরে যেতে হলো। ও আসলে ঘরটো ছাওয়াবো। না হলে থাকব কোথায়!’’
জাতে ফারাক আছে। ধর্মের ফারাক আছে। অভ্যাসের ফারাক আছে। তবে দুঃখ, দুর্দশা, দুশ্চিন্তায় একাকার হয়ে গেছেন হেদায় থেকে বিজলি, নাসির থেকে শক্তি।
Comments :0