পল্লব মুখোপাধ্যায়
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার ওপর চাপের কারণে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমে এসেছে। এই আন্দোলনে গতি এসেছে একইসঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের তুমুল বিক্ষোভে। ‘জেন-জি’দের ক্ষোভের কারণগুলির মধ্যে রয়েছে আবাসনের উচ্চমূল্য থেকে শুরু করে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গীন অবস্থা। ফ্রান্সে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ মিছিলে অংশ নেন। ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল এবং আলবেনিয়াতেও পৃথক পৃথক বিক্ষোভ হয়েছে। প্রতিটি দেশের বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ ভিন্ন হলেও, জ্বালানি ও শক্তির উচ্চমূল্য অনেক দেশের ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে। ইরান ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে পুরো মহাদেশজুড়ে ডিজেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহব্যাপী ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, স্পেনসহ ইউরোপের আরও অনেক দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
লক্ষ্যণীয়ভাবে বিভিন্ন দেশের ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের তরুণরা তাঁদের উদ্বেগের বিষয়গুলি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা শিক্ষানীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ পুঁজিবাদের সঙ্কটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন এবং কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে অস্বীকার করছেন। একই সময়ে স্পেন ও পর্তুগালে নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে সকলেই উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসনের দাবিতে এক বৃহত্তর লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন।
ফ্রান্সে ২১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব প্যারিসের শ্রমিক-অধ্যুষিত শহরতলি ক্রেতেইল-এ বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানে হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্কুলের খারাপ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। পরবর্তী সময় তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন। ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সজুড়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। হাই স্কুলের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ এবং ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং সরকারের অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ফ্রান্সেই ১১০টি মিছিলে সাড়ে ৫ থেকে ৮ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এর জবাবে ক্ষমতাসীন প্রশাসন পুলিশের মাধ্যমে দমন-পীড়ন চালায় এবং ২৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, কর্পোরেট গণমাধ্যম এখন পুরো আন্দোলনটিকে সমাজবিরোধী উপাদান দ্বারা পরিচালিত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যাতে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই গণ-অভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করা যায়। বস্তুত, এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূলে রয়েছে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়া; এটি মূলত বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই এক লড়াই।
স্পেনে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাড়িভাড়া ৮৭ শতাংশ বেড়েছে, যার ফলে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ মাথার ওপর ছাদটুকু টিঁকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্পেনের আবাসন-সংক্রান্ত এই প্রতিবাদে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ শামিল হয়েছেন। তরুণ আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি এতে অংশ নিচ্ছেন তাঁদের পরিবার এবং প্রবীণ বাসিন্দারা, যাঁরা আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়েছেন।
একদিকে, ইউরোপের অতি ধনী ব্যক্তিরা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং যুদ্ধের নেপথ্যে ক্রমবর্ধমান খরচের সুযোগ নিয়ে বিপুল মুনাফা লুটেছেন; অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী আবাসন, খাবার ও জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। যুদ্ধের পিছনে অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থ জোগাতে জাতীয় বাজেট থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো সরিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন সরকারের গৃহীত কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। আর এই ক্ষোভই আজকের এই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপজুড়ে ‘জেন জি’-র এই অভ্যুথানের মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, যার মধ্যে রয়েছে জীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেকারত্ব এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে মোকাবিলা করা অন্যান্য বাস্তব সমস্যা। ফ্রান্সের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থাও ভালো নয়। জীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষ, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব এবং শৌচাগারের অপ্রতুলতা-এই পরিস্থিতিই ‘জেন জি’-কে আন্দোলনের পথে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রজন্ম ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছেন এবং সফলভাবে গণ-আন্দোলন সংগঠিত করেছেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ইউরোপীয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন - এর নথি অনুযায়ী, ২০২৬সালের ১৬মার্চ থেকে ১৬মে-র মধ্যে ২২টি দেশে শিক্ষার্থীদের ৫৪টি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, ফ্রান্সে চলমান এই ছাত্র বিক্ষোভগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৬৮ সালে প্যারিসে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের ব্যারিকেডগুলির কথা। এছাড়া ২০০৮ সালের আর্থিক সঙ্কটের পরবর্তী সময়ে কঠোর মিতব্যয়িতা নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ২০১১ সালের ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন, লন্ডন ও প্যারিসে জলবায়ু বিষয়ক সমাবেশ এবং প্যালেস্তাইন-এর মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চালানো প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলির স্মৃতিও এর মাধ্যমে ফিরে ফিরে আসছে।
এদিকে, অস্থির পরিস্থিতিতে ফায়দা লোটার চেষ্টায় অতি দক্ষিণপন্থীরা। ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থী লি পেন থেকে শুরু করে জার্মানির নাৎসি মতাদর্শঘেঁষা ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) সকলেই জনসাধারণের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ইউরোপের দেশে দেশে সাম্প্রতিক জনসাধারণের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক অসন্তোষ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, তরুণ প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ওপর আস্থার সঙ্কট। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের এই প্রতিবাদগুলির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ শ্রমিক শ্রেণি ও বামপন্থীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বার্লিন থেকে প্যারিস পর্যন্ত বিশাল বিক্ষোভ আয়োজনের মাধ্যমে তাঁরা উগ্র দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সংকল্প নিয়েছেন।
এই বিক্ষোভগুলি ইউরোপের দেশে দেশে সরকারের সামনে একটি অভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কীভাবে জনজীবনের মান উন্নত করা যায়, সরকারি পরিষেবাগুলি বজায় রাখা যায়, পরিবারগুলিকে সহায়তা প্রদান করা যায় এবং চাপের মুখে থাকা সরকারি অর্থব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
পর্তুগালেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আবাসন ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পর্তুগালের অর্থ ও রাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী মিরান্ডা সারমেন্টো বলেছেন, “মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয়—বিশেষ করে ডিজেল ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি—নিয়ে প্রতিবাদ করছে ঠিকই, তবে তাদের মূল ক্ষোভ আবাসন ব্যয় নিয়ে। পুরো ইউরোপজুড়েই আবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে আর পর্তুগালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক।”
আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খারাপ অবস্থা ও উচ্চ টিউশন ফি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং তাঁরা প্রধানমন্ত্রী এডি রামা-র পদত্যাগ দাবি করেন। ইতালিতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিলানে মিছিল সংগঠিত হয়।
ক্যাপিটাল ইকনমিক্স-এর কেনিংহাম বলছেন, “মূল সমস্যাটি হল, রাজনীতিবিদরা অনেক ইউরোপীয় নাগরিকের সামনে উন্নত জীবনের আশা জাগাতে পারছেন না। এর কারণ হল, অর্থনীতি অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং সরকারগুলির ওপর ঋণের বোঝা বিশাল। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়ানো কিংবা কর কমানোর মতো কোনও সুযোগই তাদের হাতে নেই।”
পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠার পিছনে কারণ হিসেবে প্যারিস-এর আমেরিকান গ্র্যাজুয়েট স্কুল-এর অধ্যাপক ডগলাস ইয়েটস মনে করেন, ফ্রান্সে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের এই তীব্রতা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে ‘বিভিন্ন উপাদানের এক জটিল সংমিশ্রণ’।
সিএনবিসি-র স্টিভ সেজউইককে ইয়েটস বলেছেন, “এটি ছিল একটি সাধারণ ঝড়, যা পরে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদের রাস্তায় নামিয়ে এনেছে - যারা এমনিতেই নানা কারণে অসন্তুষ্ট ছিলেন।” ইয়েটসের মতে, এর আরেকটি কারণ হল ২০২৭ সালের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বিরোধী দলগুলি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা জনঅসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়েন লেকর্নু ২০২৭ সালের জন্য একটি বাজেট প্রস্তাব করেছেন, যার লক্ষ্য হল ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা। চলতি বছর এই ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫.৪ শতাংশে পৌঁছবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সূচক অপরিবর্তিত রাখা এবং অসুস্থতাজনিত ছুটির বিপরীতে অর্থ প্রদানের নিয়ম আরও কঠোর করা।
ইয়েটস আরও বলছেন, “সবশেষে রয়েছে শিক্ষার্থীরা - সেই দরিদ্র শিক্ষার্থীরা - যারা তাঁদের জীর্ণ অবকাঠামো মেরামত এবং শ্রেণিকক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বসানোর মতো যুক্তিসঙ্গত দাবি জানিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা করেছিল। এখন এই তিনটি শক্তি একত্রিত হয়ে একটি অনিয়ন্ত্রিত ঘূর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আরও খারাপ হয়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো ‘ইনসি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটিতে বেকারত্বের হার বেড়ে ৮.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২৭ লক্ষ মানুষের কর্মহীনতাকে নির্দেশ করে। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে ২১.৬ শতাংশ হয়েছে। ইনসি-এর চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ভোক্তা মূল্য সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.১ শতাংশ বেড়েছে, যা আগস্ট মাসে ছিল ২.৪ শতাংশ। এ সময় জ্বালানির দাম ২১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, ‘ল্য মঁদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ইনসি-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাথাপিছু ক্রয়ক্ষমতা ০.৭ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ‘ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অফ ইকনমিক্স’-এর হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ক্রয়ক্ষমতায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দুই প্রাপ্তবয়স্ক ও দুই শিশুবিশিষ্ট একটি পরিবারের ক্ষেত্রে বছরে ১,২০০ ইউরো (১,৩৪৫ মার্কিন ডলার) এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬০০ ইউরো ক্ষতির সমান।
পর্তুগালের সারমেন্টো জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন; ফ্রান্সের তুলনায় পর্তুগালের আর্থিক অবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং তাদের ঋণের পরিমাণও অনেক কম। তিনি বলেন, “যেসব দেশের সরকারি ঋণের বোঝা বেশি, তাদের হাতে পদক্ষেপ নেওয়ার মতো আর্থিক সুযোগ বা পরিসর খুবই সীমিত। তবে মূল সমস্যা হল, ইউরোপীয় পর্যায়ে আমাদের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সঙ্কটের সমাধান করতে হবে।” সারমেন্টো আরও যোগ করেছেন, “ইউরোপের অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্রুত বাড়ছে না। আর অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ছাড়া ভালো বেতন পাওয়া কিংবা উন্নত সরকারি পরিষেবা ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ জোগাড় করা অসম্ভব।” ইউরোস্ট্যাট-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির মধ্যে পর্তুগালেই বাড়ির দাম সবচেয়ে বেশি হারে বেড়েছে যা আগের বছরের তুলনায় ১৬.৫ শতাংশ বেশি।
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতার কারণে দেশটির ঋণ ও বাজেট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে, যার ফলে ফরাসি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইউরোর মান কমে গেছে। গোল্ডম্যান স্যাচস-এর ইউরোপীয় ইকুইটি স্ট্র্যাটেজি-র প্রবীণ বিশেষজ্ঞ শ্যারন বেল সিএনবিসি-এর ‘স্কোয়াক বক্স ইউরোপ’ অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছেন, “কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা কঠিন হবে। ফরাসি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর করের বোঝা বাড়তে পারে। আমার মনে হয়, সামগ্রিকভাবে ফ্রান্সে করের হার বাড়তে পারে। আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার অর্থ হল হয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে, নতুবা কর বাড়াতে হবে। আর এই বিষয়গুলি অত্যন্ত জটিল।” আরবিসি-র ব্লু বে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট-এর মার্কেট স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান মাইক বেল-এর মতে, ফ্রান্স একটি ‘বাস্তব’ ঋণ সঙ্কটের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ফ্রান্সের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হল আর্থিক অবস্থার সুরাহা করা। সেখানে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো প্রয়োজন-যেখানে গড় আয়ু ৮৪ বছর, সেখানে ৬২বছরে অবসরে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু অবসরের বয়স বাড়ানোর আলোচনা শুরুর আগেই যদি এমন অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে বাস্তবে বয়সসীমা বাড়ানোর চেষ্টা করলে ফ্রান্সের রাস্তায় কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ইউরোপে সাম্প্রতিক ছাত্র-অভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করল যে, সমাজে সবার জন্য অবৈতনিক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার একমাত্র সমাধান হল সমাজতান্ত্রিক ও পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
Gen-Z Movement
ইউরোপজুড়ে জেন-জি অভ্যুত্থান
সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকরা।
×
Comments :0