ভ্রমণ — বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
সুমন চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ২৩ মে ২০২৬
ইস্তাম্বুল: সময়ের সরণী ও একটি অবাধ্য শহরের আখ্যান
২০২৪ এর ফেব্রুয়ারিতে, শীতের শেষে, ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট থেকে সুদীর্ঘ রাস্তা ট্যাক্সিতে বসে তাকসিম স্কোয়ারের কাছে আমার হোটেলের দিকে যেতে যেতে রাস্তার ধার ঘেঁষে এতদিন ধরে ছবির বইতে দেখে আসা সৌধগুলিকে নিজের চোখে দেখতে দেখতে আমার নিজেকে খানিকটা 'টাইম মেশিন'-এর যাত্রী মনে হচ্ছিল ।
ইস্তাম্বুল এক অভিনব শহর । আজকের কলকাতা এবং হাওড়া যেমন দুই যমজ শিশুর মতন গঙ্গার দুই পাড়ে বেড়ে উঠেছে, ইস্তাম্বুলও সেরকম বসফরাস প্রণালীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে; তবে একটি শহর হিসেবে, একটিই নামে । হাঙ্গেরির 'বুদা' এবং 'পেস্ট' কিংবা আমাদের হাওড়া এবং কলকাতার মতন নয় । প্রকৃতপক্ষে শহরটির একটি অংশ এশিয়াতে এবং বাকিটুকু ইউরোপে—এটি এক অনবদ্য বৈশিষ্ট্য, যা প্রায় দুর্লভ । শহরের দুটি অংশ একাধিক ব্রিজ এবং আন্ডারওয়াটার টানেলের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুক্ত ।
সেইরকমই একটি ব্রিজের উপর দিয়ে ট্যাক্সি যখন এগিয়ে চলেছে, আমার মনে হচ্ছিল আমি যা দেখছি তা শুধু কিছু দৃশ্যকল্প নয়, বরং এই শহরের উপস্থিতি ও ব্যাপ্তি সর্বব্যাপী । জলের ঢেউ, স্থাপত্যশৈলী, জীবনের শব্দ এবং অনুপস্থিতি—সর্বত্রই ইস্তাম্বুল উপস্থিত । গোল্ডেন হর্ন-এর ওপাড়ে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নিরাসক্তির সাথে দাঁড়িয়ে থাকা গালাটা টাওয়ার (Galata Tower) । তার উচ্চতা খুব বেশি নয়, তার স্থাপত্যও কোন অসাধারণ গৌরবের দাবি করে না, কিন্তু তার অবস্থানই যেন সেই সর্বব্যাপী উপস্থিতির দ্যোতক ।
এই টাওয়ার সাক্ষী সেই জেনোয়ান বণিকদের সময় থেকে অটোমান আক্রমণ, এক জগৎব্যাপী সাম্রাজ্যের রাজধানী হওয়ার গৌরব, খ্যাতি ও সমৃদ্ধির চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ, সবকিছু বদলে দেওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, প্রবল প্রতাপী সাম্রাজ্যের পতন, প্রজাতন্ত্র, বিবর্তন, বর্তমানের খানিকটা দমচাপা দিনগুলি এবং সময়ের চাকাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ঐকান্তিক প্রয়াস—সকল কিছুর । সে নিজে থেকে কিছুই বলে না, কিন্তু তার অস্তিত্বই এক সোচ্চার বিবৃতি । ইস্তাম্বুলকে বুঝতে গেলে এই সব নীরব সাক্ষীদের দেখা এবং বোঝা ভীষণ জরুরি । গালাটা টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে মনে হয় এই শহরের ইতিহাস এবং সময়, কোনটাই কখনও সরলরেখায় এগোয়নি; বরং তা বারবার ঘটনাপরম্পরার অভিঘাতে নিজের রাস্তা পরিবর্তন করেছে, ভেঙেছে, জোড়া লেগেছে এবং অন্য খাতে বয়ে গেছে ।
চলবে
Comments :0