দীপশুভ্র সান্যাল
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দীর্ঘদিনের জমিজট কাটিয়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের আশায় নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর প্রশাসন ঘোষণা করেছে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত লাগোয়া প্রয়োজনীয় জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই ঘোষণার পর থেকেই তৎপর হয়েছে জেলা প্রশাসন ও ভূমি দপ্তর। সোমবার প্রশাসনের প্রতিনিধি দল সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে জমি পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেন।
জলপাইগুড়ি জেলার মানিকগঞ্জ সাতকুড়া এলাকা, ধরধরা পাড়া-সহ বিস্তীর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আজও কয়েক কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের বোদা জেলা লাগোয়া এই অঞ্চলগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের সমস্যা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হলে সীমান্ত আরও সুরক্ষিত হবে এবং সাধারণ মানুষও নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবেন।
কিন্তু প্রশাসনিক উদ্যোগের মধ্যেই সামনে এসেছে বহু পুরনো জমিজটের সমস্যা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দক্ষিণ বেরুবাড়ির অ্যাডভর্স পজেশনের চিলাহাটির বনগ্রাম, মরিয়াপাড়া, ডাকেরকামাত ও কাজলদিঘির মতো সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে এখনও বহু জমির সরকারি নথিতে বাংলাদেশের বোদা জেলার নাম রয়ে গিয়েছে। ২০১৫ সালে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল চুক্তির মাধ্যমে এলাকাগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলেও জমির রেকর্ড সংশোধনের কাজ আজও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে জমির মিউটেশন, মালিকানা ও সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি হস্তান্তরের জন্য স্থানীয়দের ‘নো অবজেকশন’ চাওয়া হলেও গ্রামবাসীদের একাংশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, জমির নথি সংশোধন না হলে তাঁরা কোনও ভাবেই সম্মতি দেবেন না। স্থানীয় বাসিন্দা চিন্ময় রায় বলেন, “আমরা ভারতের নাগরিক, ভোট দিই, সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাই। অথচ জমির কাগজে এখনও বাংলাদেশের বোদা জেলার নাম লেখা রয়েছে। আগে সরকারকে এই জমিগুলিকে সরকারি নথিতে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিজেদের নামে বৈধ কাগজ না পেলে কোনও নো অবজেকশন দেওয়া হবে না বলে বিডিও সাহেবকে জানিয়ে দিয়েছি।”
সীমান্তবর্তী এলাকার বহু মানুষের কৃষিজমি ও চা বাগান কাঁটাতারের ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যেই রয়েছে। স্থানীয় সিপিআইএম নেতা হাসিফুল ইসলামের অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের আমলে স্থানীয় তৃণমূল নেতা ও জমির দালালদের টাকা না দিলে বহু মানুষকে নিজেদের জমিতে চাষ করতে যেতে দেওয়া হতো না। তিনি বলেন, “সীমান্তের ওপারে নিজেদের জমিতে যেতে গ্রামের সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর টাকা দিতে হয়েছে। বহু কৃষক এবং চা বাগানের সঙ্গে যুক্ত মানুষ চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ প্রশাসন কোনও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয়নি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওই জমিতে বসবাস করলেও এখনও অনেক পরিবার নিজেদের নামে পাট্টা বা বৈধ নথি পাননি। ফলে কৃষিঋণ, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা, জমি বিক্রি কিংবা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নানা কাজে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সরকারি নথিতে অসঙ্গতি থাকায় সীমান্তের বহু মানুষ কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
সিপিআই(এম) জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক পীযূষ মিশ্র বলেন, “সীমান্তের জমির সমস্যা মেটাতে কেন্দ্র ও রাজ্য — দুই সরকারকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত সংশোধন করে স্থানীয় গ্রামবাসীদের হাতে বৈধ নথি তুলে দিতে হবে। সীমান্তের ওপারে অশান্তি বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব আমাদের জেলাতেও পড়ে। পাশাপাশি কাঁটাতারের ওপারে থাকা কৃষিজমি ও চা বাগানে যাতায়াতের জন্য স্থানীয় মানুষের সুবিধাজনক ব্যবস্থা করতে জেলা প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। সিপিআই(এম)-র তরফে যে দাবি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরা হয়েছে এলাকায় মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুক বিএসএফ। অযথা স্থানীয় মানুষদের হয়রানি বন্ধ করুক তারাও ভারত ভূখণ্ডের নাগরিক।”
অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। তবে সীমান্তবাসীদের বক্তব্য, শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, জমির অধিকার ও জীবিকার সমস্যারও স্থায়ী সমাধান জরুরি। এখন দেখার, প্রশাসন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমিজট কাটিয়ে বিএসএফের হাতে জমি তুলে দিতে পারে কিনা।
Comments :0