প্রকৃতির মারে দিশেহারা উত্তরবঙ্গের কৃষিজীবী মানুষ। মরসুমের একেবারে শেষ লগ্নে অতর্কিত বৃষ্টির দাপটে জলপাইগুড়ি জেলার বিস্তীর্ণ অংশের আলু চাষ কার্যত ধুলিসাৎ। বিঘার পর বিঘা জমিতে থাকা আলু এখন জলের তলায় পচে কাঁদা হয়ে গিয়েছে। বিঘার পর বিঘা মাঠ এখন এক পচা আলুর দুর্গন্ধময় ভাগাড়। এই তীব্র গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও সরকারি স্তরে কোনো হেলদোল নেই বলে অভিযোগ। বিপর্যস্ত কৃষকদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে সারা ভারত কৃষক সভা।
এই বিপর্যয়ের অভিঘাত শুধু আলুর ক্ষতিতেই থমকে নেই। কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মাঠের এই পচন আগামী খরিফ মরসুমকেও গ্রাস করবে। জমিতে পচে থাকা আলু থেকে নির্গত অতিরিক্ত নাইট্রোজেন এবং ব্যাপক ছত্রাক সংক্রমণ চাষের মাটির ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। এই অবস্থায় তড়িঘড়ি ধান বা পাট চাষ শুরু করলে চারা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে আগামী মরসুমেও বড়সড় লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে কৃষকদের।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সনাতন রায় আক্ষেপের সুরে জানান, “চড়া সুদে ঋণ নিয়ে রাতদিন এক করে ফসল ফলিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার দেনা শোধ হবে। কিন্তু সব মাঠেই শেষ হয়ে গেল। এখন সামনের দিনে কী খাব, আর কী দিয়েই বা নতুন চাষ করব—কিছুই মাথায় আসছে না।”
রবিবার ধূপগুড়ি বিধানসভার বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই (এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায় গাদং-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় প্রচারে গেলে কৃষকরা বর্তমান দুই সরকাররের বিরুদ্ধে তাঁদের অভাব-অভিযোগ উগরে দেন। মাঠের পর মাঠ পচা ফসল দেখিয়ে তাঁরা জানান, সংকটের এই মুহূর্তে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের কোনো প্রতিনিধি তাঁদের খবর নিতে আসেননি।
কৃষকদের এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে সারা ভারত কৃষক সভার জলপাইগুড়ি জেলা কমিটি। সংগঠনের পক্ষ থেকে কৃষি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জমি পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জমিতে পচনজনিত সংক্রমণ রুখতে বিঘাপ্রতি ২-৩ কেজি ব্লিচিং পাউডার দিয়ে জমি শোধন করতে হবে। জমিকে কিছুদিন চড়া রোদে ফেলে রেখে প্রাকৃতিকভাবে বিষক্রিয়া কমাতে হবে। তড়িঘড়ি ধান চাষে না নেমে মাটির স্বাস্থ্য ফেরানোর দিকে নজর দিতে হবে।
এই সংকটের মাঝেও রাজ্য প্রশাসনের নির্লিপ্ততা নিয়ে সরব হয়েছে কৃষক সভা। জেলা সম্পাদক প্রাণ গোপাল ভাওয়াল কড়া ভাষায় বলেন, “চাষির ঘরে যখন হাহাকার, সরকার তখন উৎসব আর প্রচারে মত্ত। এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে কোনো ত্রাণ বা বিকল্প চাষের সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। আমরা দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে শস্য বিমার টাকা মেটাতে হবে এবং জমি শোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্লিচিং পাউডার ও সার বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে।”
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর সরকারের উদাসীনতার সাঁড়াশি চাপে জলপাইগুড়ির কৃষক আজ খাদের কিনারে। দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ না মিললে আগামী দিনে জেলাজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
Jalpaiguri
অকাল বর্ষণে বিপর্যস্ত জলপাইগুড়ি, পচেছে আলু উদাসীন সরকার
শালবাড়ি এলাকায় ভোট প্রচারে বাম প্রার্থী।
×
Comments :0