মুক্তধারা
উৎসব ১৪৩৩
গল্প
ফেরা
সৌরীশ মিশ্র
২১ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
এক
"বৌমা, বাবু এরমধ্যে ফোন করেছিল?" থালার ভাঙা ভাতে বাটি থেকে ডাল ঢেলে মাখতে-মাখতে সরস্বতীকে শুধোয় জলধর।
"না বাবা।" পাঁচমেশালি তরকারির বাটিটা শ্বশুরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে সরস্বতী।
"করেনি?" ভাত মাখা থামায় বৃদ্ধ জলধর। কি যেন ভাবে। তারপর মুখ তুলে বৌমার দিকে তাকায় সে। তারপর বলে, "গত পুজোতে এসছিল ছেলেটা। বছর ঘুরতে চলল। এ বছরের পুজোও তো এসে গেল প্রায়।"
"কি করবে বাবা ও। ওদের কাজটাই তো এই রকম। ছুটিছাটা তো নেই-ই।"
"জানি বৌমা। কিন্তু মন যে মানে না।" একটু থামে জলধর। তারপর বলে, "আসলে কি জানো তো বৌমা, বয়স হয়েছে তো। কখন আছি, কখন নেই। তাই ..."
শ্বশুরকে কথা শেষ করতে দেয় না সরস্বতী। জলধরের কথার মাঝখানেই ঢোকে সে, "এ রকম কথা আপনাকে কতদিন বলতে বারণ করেছি না বাবা। আপনি জানেন না, এ সব কথা শুনলে আমার কতটা কষ্ট হয়।" শাড়ি দিয়ে চোখ মোছে সরস্বতী।
বৌমার কথায় ভালো লাগে জলধরের। মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো।
"ঠিক আছে বৌমা বলব না, আর বলব না দেখো।" অপ্রস্তুত জলধর পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। আবার ভাত মাখতে থাকে সে।
দুই
সরস্বতীর স্বামী জগন্নাথ বাস্কে বি এস এফ সৈনিক। বেশিরভাগ সময়ই দুর্গম স্থানে ডিউটি থাকে ওর। যেমন, এখন সে কাশ্মীরের এক প্রত্যন্ত এলাকায় কর্তব্যরত। পাহাড়ি এলাকাটা এতোটাই প্রতিকূলতায় ভরা যে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পর্যন্ত পৌঁছায় নি সেখানে আজও। তাই সরস্বতীর সাথে জগন্নাথের কথা হয় বড় অনিয়মিত। তবে সময় সুযোগ পেলেই জগন্নাথ সরস্বতীকে ফোন করতে ভোলে না। এই যেমন দিন পনেরো আগে শ্রীনগর থেকে ফোন করেছিল জগন্নাথ। কি যেন একটা কাজে এসেছিল সেখানে সে। তখন দুপুর-একটা মতোন বাজে। স্নানে যাবে-যাবে করছিল সরস্বতী। হঠাৎ বেজে উঠেছিল সরস্বতীর মোবাইলটা। ফোনটা ধরতেই ভেসে এসেছিল জগন্নাথের গলা। নিজেকে ধরে রাখতে পারে নি সরস্বতী। চোখে জল চলে এসে গিয়েছিল তার। টানা কুড়ি মিনিট কথা বলেছিল ওরা। কথা যেন আর শেষ হতেই চায় না! ওর কথা শেষ হতেই সরস্বতী জলধরের সাথেও কথা বলিয়ে দিয়েছিল জগন্নাথের।
তিন
ঐদিনের পর এর মধ্যে আর ফোন করেনি জগন্নাথ। সরস্বতী আশায় আশায় আছে যে কোনো মুহূর্তে আবার বেজে উঠবে তার ফোনটা। আর ফোনটায় "হ্যালো" বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসবে ওর স্বামীর কণ্ঠস্বর।
চার
এরপরও সাত-সাতটা দিন কেটে গেছে। জগন্নাথের ফোন আসেনি। সরস্বতীর উদ্বিগ্নতা বাড়ে। জলধরও তার উৎকণ্ঠা চেপে রাখতে পারে না। পুজোর আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এবারে তবে কি পুজোয় বাবু আসতে পারবে না বাড়ি? প্রশ্নটা সবসময় মাথায় ঘুরতে থাকে জলধরের। তাই সে, সরস্বতীর মোবাইল বেজে উঠলেই ওর ঘর থেকে রুগ্ন দেহেও কোনো মতে বেড়িয়ে আসে। জিজ্ঞাসা করে সরস্বতীকে "কার ফোন বৌমা? বাবুর?"
সরস্বতী মাথা নেড়ে "না" বলে। আরো একবার হতাশ হয় জলধর। আবার দেওয়াল ধরে-ধরে ধীর পায়ে ফিরে যায় সে তার ঘরে।
পাঁচ
ঠিক তার পরের দিনের কথা। তখন কাকভোর। ভোরের সেই নিস্তব্ধতাকে খান-খান করে বেজে উঠল সরস্বতীর মোবাইলটা।
ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল সরস্বতী। বালিশের পাশেই রাখা ছিল মোবাইলটা। এতো সকালে কে ফোন করলো! মোবাইলটা হাতে নেয় সরস্বতী। ঘুম চোখে আলো জ্বলে ওঠা স্ক্রিনে ও দেখল কাশ্মীরের এস টি ডি কোডকে সামনে রেখে একটা অজানা ল্যান্ডলাইন নম্বর ফুটে উঠেছে স্ক্রিনে। নির্ঘাত স্বামীর ফোন। এক মুহূর্তও নষ্ট করে না সরস্বতী। যদি কেটে যায় লাইনটা! ফোনটা ধরে কানে লাগায় সে। বলে, "হ্যালো..."
"হ্যালো" ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক পুরুষ কণ্ঠস্বর।
এ গলা কার! অবাক হয় সরস্বতী। এ তো তার স্বামীর গলা নয়।
"হ্যালো, সরস্বতী বৌদি বলছেন?" ফোনের ওপার থেকে আবার ভেসে আসে কথা।
"হ্যাঁ বলছি।" কোনোমতে কথাকটা বলতে পারে সরস্বতী। কেন জানি হঠাৎই এক অজানা আশংকা এসে বাসা বেঁধেছে তার মনে।
"বৌদি আমি সুধাংশু বলছিলাম। আপনাদের পাশের গ্রাম ডিমলাতে থাকি। জগন্নাথের কলিগ। গত পুজোয় অষ্টমীর দিন গিয়েছিলাম আপনাদের বাড়ি আমার স্ত্রীকে নিয়ে। চিনতে পারছেন?"
"হ্যাঁ, চিনতে পারছি। কিন্তু এতো সকালে আপনি ফোন করছেন..."
"একটা খবর দেওয়ার ছিল বৌদি।"
"খবর? কি খবর?"
"জগন্নাথের অবস্থা খুব ক্রিটিক্যাল বৌদি।" একটু থামে সুধাংশু। তারপর ফের বলতে থাকে সে, "কাল মাঝরাতে আমরা লাইন অফ কন্ট্রোলের কাছে ডিউটিতে ছিলাম। আচমকাই ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি উড়ে আসতে থাকে বর্ডারের ওপার থেকে। আমাদের লিড করছিল জগন্নাথই। ও আমাদেরকে বাঁচাতে বুক পেতে দেয় বুলেটের সামনে। অনেক কটা বুলেট ওর শরীরে লেগেছে বৌদি..." চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসে ফোনের ওপাশ থেকে।
সরস্বতীর হাত থেকে মোবাইলটা মেঝেতে পরে ভেঙে দু' টুকরো হয়ে যায়।
সরস্বতীও জ্ঞান হারায় সাথে সাথেই।
ছয়
বিজয়া দশমীর বিকেল। কোন দূর থেকে যেন ভেসে আসছে বিসর্জনের বাজনা! জগন্নাথ এইমাত্র ফিরলো বাড়ি। পুজোয় এবার আসা হয় নি ওর। তাছাড়া এবারের ফেরাটা অন্যান্যবারের ফেরাগুলোর থেকে আলাদাও পুরো। আজ যে ফিরেছে ও তেরঙায় ঢাকা একটা কফিনে বন্দী হয়ে।
Comments :0