নতুনপাতা
দীপাবলি ১৪৩৩
নতুন বারান্দা — ধারাবাহিক
মা, আমারও তো বাড়ি ফেরার কথা ছিল : সৌম্যদীপ জানা
৮ নভেম্বর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
কলেজের ফি বাকি পড়ল। বাড়ির ওষুধের খরচ বাড়ল। তিয়াশার পড়াশোনার খরচ সামনে এল।
অয়ন প্রথমে ভেবেছিল, কিছুদিন কাজ করে আবার পড়াশোনায় ফিরবে। কিছুদিন কখন যে দীর্ঘ মাসে পরিণত হল, আর মাসগুলি কখন যে তার বয়সের কয়েকটি বছর চুরি করে নিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
এখন সে অনলাইনে খাবার পৌঁছে দেয়।
শহরের যে রাস্তাগুলির ইতিহাস সে একসময় বইয়ে পড়েছিল, সেই রাস্তাগুলিই এখন তার কর্মক্ষেত্র। যে পুরোনো বাড়িগুলির স্থাপত্য দেখে তার বিস্মিত হওয়ার কথা ছিল, সেগুলির দরজায় সে খাবারের প্যাকেট রেখে আসে। যে পুজোমণ্ডপগুলির শিল্পকলা দেখে তার মুগ্ধ হওয়ার কথা ছিল, সেগুলির সামনে সে লাল আলোয় দাঁড়িয়ে অর্ডারের অপেক্ষা করে।
ইতিহাসের ছাত্র থেকে সে হয়ে উঠেছে সময়ের কর্মচারী।
তার প্রতিটি মিনিটের একটি মূল্য আছে। শুধু তার নিজের জীবনের মিনিটগুলির কোনও হিসাব কেউ রাখে না।
---
এ বছর পুজোর অনেক আগে থেকেই অয়ন ঠিক করেছিল, কয়েকটা দিন সে কাজ করবে না।
পরিকল্পনাটা খুব বড় কিছু ছিল না। ষষ্ঠীর দিন নতুন পাঞ্জাবি পরে বন্ধুদের সঙ্গে বেরোবে। সপ্তমীর রাতে উত্তর কলকাতার পুরোনো বনেদিবাড়ির পুজো দেখবে। অষ্টমীর অঞ্জলি দেবে। নবমীর রাতে তিয়াশাকে নিয়ে বড় কোনও মণ্ডপে যাবে। আর দশমীর দিন মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকবে। মা প্রতি বছর নারকেল নাড়ু বানান। বাবার শরীর ভালো থাকলে সবাই মিলে দুপুরে খাবে।
এই সামান্য পরিকল্পনাটুকুর জন্য সে প্রায় তিন মাস ধরে টাকা জমিয়েছিল।
বন্ধু ঋত্বিকের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল।
'এইবার কিন্তু কেউ কাজের অজুহাত দিবি না,' ঋত্বিক বলেছিল। 'চার দিন একেবারে নিজেদের।'
অয়ন হেসে বলেছিল, 'বস, এইবার আমায় কেউ আটকাতে পারবে না।'
তখন সে জানত না, মানুষকে সব সময় কেউ আটকায় না। কখনও কখনও তার দায়িত্বগুলিই তার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, যাওয়ার আগে আমাদের কথা ভেবে যাও।
মহালয়ার আগের দিন রাতে বাবার ওষুধ শেষ হয়ে গেল। পরদিন ডাক্তার দেখাতে হবে। তার উপর বাড়িওয়ালা আগের মাসের বকেয়া ভাড়ার কথা মনে করিয়ে দিলেন। তিয়াশার স্কুলে পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার শেষ তারিখও এগিয়ে এল।
মা হিসাবের খাতাটা খুলে বসেছিলেন।
অয়ন দেখেছিল, খাতার পাতায় সংখ্যাগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। একদিকে ওষুধ, অন্যদিকে ভাড়া। একদিকে বাজার, অন্যদিকে স্কুলের ফি। সব হিসাব মেলানোর পরও কিছু টাকা যেন কোথাও থেকে ধার করতে হবে।
মা তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, 'তুই ক'দিন কাজ না করলে খুব অসুবিধে হবে?'
প্রশ্নটা সাধারণ ছিল।
কিন্তু অয়নের মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার পুজোর চার দিনের পরিকল্পনাটাকে টেবিলের উপর রেখে তার দাম জানতে চাইছে।
সে বলেছিল, 'না, অসুবিধে হবে না।'
মা একটু স্বস্তি পেয়েছিলেন।
অয়ন আর বলেনি, সেই চার দিনই ছিল তার নিজের জন্য রাখা সারা বছরের সামান্য অবসর। বলেনি, নতুন পাঞ্জাবিটা সে আগেই কিনে রেখেছে। বলেনি, ঋত্বিককে কথা দিয়েছে। বলেনি, সে-ও আর পাঁচটা তেইশ বছরের ছেলের মতো বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে ঘুরতে চায়।
কারণ বাড়ির মধ্যে যখন ওষুধের গন্ধ আর হিসাবের খাতার শব্দ একসঙ্গে ভেসে বেড়ায়, তখন নিজের আনন্দের কথা বলতে মানুষের লজ্জা হয়।
নিজের বাড়িতেই সে যেন নিজের ইচ্ছার কাছে অপরাধী হয়ে দাঁড়ায়।
---
চলবে
দশম শ্রেণী, কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা।
Comments :0