Editorial

শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে নতুন উদ্দীপনা

সম্পাদকীয় বিভাগ

বিশ্ব রাজনীতিতে যে দক্ষিণপন্থী জোয়ার দেখা দিয়েছিল, তা কিছুটা ধাক্কা খাওয়ার ইঙ্গিত সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও অঞ্চলে লক্ষণীয়ভাবে বামপন্থী শক্তির উল্লেখযোগ্য পুনরুত্থান ঘটেছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বামপন্থী রাজনীতি নতুনভাবে চালিকাশক্তি লাভ করেছে। শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের দাবিগুলি আবার রাজনীতির ভরকেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে। 
অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে শুধু উগ্র দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধাক্কা খাওয়াই নয়, সে দেশের ইতিহাসের সর্বাধিক সংখ্যক বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলির প্রতিনিধি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নির্বাচিত হয়েছেন। তার আগে ইজরায়েলের নির্বাচনে উগ্র দক্ষিণপন্থী নেতানেয়াহুর দলের জনসমর্থন অনেকটা কমে যাওয়া এবং সে দেশের রাজনীতিতে আরব দলগুলির উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ব্রাজিলের নির্বাচনে বামপন্থী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী লুলার প্রত্যাবর্তন, বুলগেরিয়ার নির্বাচনে বামপন্থী জোটের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হওয়া, হাঙ্গেরিতে ১৬বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয় ইত্যাদি ঘটনাপ্রবাহ একই ইঙ্গিত বহন করছে। 
অন্যদিকে, ইউরোপ জুড়ে বিক্ষোভের আগুন দেখা যাচ্ছে, রাস্তায় নামছেন হাজার হাজার শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ, তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও আলবেনিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও তরুণরা বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। কোথাও সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে, কোথাও আবাসন সঙ্কট, আবার কোথাও শিক্ষা ও সামরিক নিয়োগের বিরোধিতায় চলছে আন্দোলন। এই বিক্ষোভের পেছনে অন্যতম বড় কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বাড়িভাড়ার উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। অনেকের আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব হচ্ছে না।
এর পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আবাসন সঙ্কট, বেকারত্ব, কম বেতন এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়া ও আবাসন সঙ্কট বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবা এবং জার্মানিতে সামরিক নিয়োগ সংক্রান্ত নীতি নিয়ে তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে। ইতালিতেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা খরচ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবিতে তরুণরা প্রতিবাদ করছেন। 
ইউরোপের কৃষকদের আন্দোলনের পেছনে রয়েছে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কম লাভ, সরকারি বিধিনিষেধ এবং আমদানি প্রতিযোগিতার চাপ। শ্রমিকদের একটি অংশ বেতন বৃদ্ধি, পেনশন সুবিধা ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলন করছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো একটার পর একটা ধর্মঘটে শামিল হচ্ছে। ইউরোপ জুড়ে এখন ধর্মঘটের ‘বসন্ত’ শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউরোপের বিক্ষোভের পেছনে কোনও একক কারণ কাজ করছে না। অর্থনৈতিক চাপ, আবাসন সঙ্কট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সরকারি নীতির বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকে তীব্র করছে।  
আমাদের দেশেও সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণআন্দোলন ও কৃষক আন্দোলনের পেছনে বামপন্থী ছাত্র ও কৃষক সংগঠনগুলোর রাস্তায় নেমে আন্দোলনে সক্রিয়তা বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। দেশের জনজীবনে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মুদ্রাস্ফীতি, বেকারি, কর্পোরেট সংস্কৃতির আধিপত্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার ঘটনা এই সমস্ত জনবিক্ষোভের স্ফুরণ ঘটিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও দুর্নীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিতে আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি’র ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটাচ্ছে। দেশের চরম দক্ষিণপন্থী শাসক দলের পক্ষে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধ বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। তরুণ প্রজন্মও আশাতীতভাবে এই আন্দোলনের পক্ষে অংশগ্রহণ করছে। ১১০তম নভেম্বর বিপ্লব দিবসের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনীতিতে এই ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  

 

Comments :0

Login to leave a comment