কোনও আগাম ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বাংলার ডেয়ারির বিভিন্ন ধরনের দুধের দাম লিটারপ্রতি ৪টাকা বাড়াল রাজ্য সরকার। গত ১নভেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলার ডেয়ারির দুগ্ধজাত পণ্যের দামও বেড়েছে ১৫থেকে ২৫টাকা পর্যন্ত। রাজ্য সরকারের পরিচালিত সংস্থার এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে সংসারের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে আয় বাড়ছে না। অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
গত ১নভেম্বর বাংলার ডেয়ারির কাউন্টারে দুধ কিনতে গিয়ে নতুন দাম জানতে পারেন ক্রেতারা। বিডি আয়ুশ টোনড মিল্ক, বিডি তৃপ্তি স্পেশাল এবং বিডি স্বাস্থ্যসাথী ডবল টোনড মিল্ক সহ বিভিন্ন ধরনের দুধের দাম লিটার প্রতি ৪ টাকা করে বেড়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, বিডি মালাই ফুল ক্রিম দুধের এক লিটারের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য (এমআরপি) ৭০ টাকা, বিডি সুপ্রিম স্ট্যান্ডার্ডাইজড দুধের ৬৪ টাকা এবং বিডি তৃপ্তি স্পেশাল কাউ মিল্কের ৫৮ টাকা। বিডি আয়ুশের দাম ৫৬ টাকা, বিডি স্বাস্থ্যসাথী ডবল টোনড দুধের ৫২ টাকা এবং বিডি স্বাস্থ্যসাথী লুজ দুধের দাম লিটার প্রতি ৪৫টাকা হয়েছে।
দুধের পাশাপাশি পনির, দই ও ঘিয়ের দামও বেড়েছে। ২০০ গ্রাম বিডি মালাই পনিরের নতুন দাম ৯৩ টাকা, এক কেজির ৪২০ টাকা। বিডি স্লিম ফ্রেশ পনিরের এক কেজির দাম ৩১০টাকা। ৪০০ গ্রাম বিডি দইয়ের দাম ৩৫ টাকা এবং এক কেজির ৭৮টাকা হয়েছে। ৫০০ মিলিলিটার বিডি ঘিয়ের নতুন এমআরপি ৩৯৯ টাকা।
ক্রেতাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ, এই মূল্যবৃদ্ধির কোনও আগাম ঘোষণা করা হয়নি। জানা গিয়েছে, গত ২৯ অক্টোবর সরকার এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে। তবে সেটি ছিল অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা; সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আগাম কোনও বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। ক্রেতাদের আশঙ্কা, সরকারি সংস্থার দুধের দাম বাড়লে বেসরকারি সংস্থাগুলিও দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। তাঁদের একাংশের প্রশ্ন, বিক্রি কমে গেলে বাংলার ডেয়ারির ভবিষ্যৎ কী হবে? সংস্থাটিকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, খুচরো বাজারে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বাড়লেও গ্রামাঞ্চলে দুগ্ধচাষিদের কাছ থেকে দুধ কেনার দর বাড়েনি বলে অভিযোগ। গোরুর মালিকরা এখনও প্রতি কেজি দুধ বিক্রি করে পাচ্ছেন ৩৬ টাকা। অর্থাৎ, ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম নেওয়া হলেও তার সুফল উৎপাদকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসে মাদার ডেয়ারি সংস্থা বাংলার ডেয়ারির সঙ্গে মিশে যায়। ১৯৭৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (এনডিডিবি) ‘অপারেশন ফ্লাড’-এর অধীনে মাদার ডেয়ারি চালু করেছিল। পরে কেন্দ্রীয় সরকার সংস্থাটির দায়িত্ব রাজ্য সরকারের হাতে তুলে দেয়। এরপর রাজ্য সরকার ‘বাংলার ডেয়ারি’ নামে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করে। গত ডিসেম্বর মাসে সেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে মাদার ডেয়ারির সংযুক্তিকরণ হয়।
সিআইটিইউ নেতা প্রদীপ মিত্রের দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে রাজ্যে দৈনিক প্রায় ৪লক্ষ লিটার দুধ উৎপাদিত হতো। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ লক্ষ লিটারে দাঁড়িয়েছে। তাঁর আরও দাবি, আগে সংস্থায় প্রায় ৪০০ কর্মী কাজ করলেও বর্তমানে কর্মীর সংখ্যা কমে ৪০-এর কাছাকাছি। বাংলার ডেয়ারিতে এজেন্সির মাধ্যমে কাজ চালানো হচ্ছে এবং দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। সিআইটিইউ নেতৃত্বের বক্তব্য, উৎপাদন ও কর্মীসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না করে শুধু দুধের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তৃণমূল সরকারের আমলে মাদার ডেয়ারি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ ক্রেতারাও। তাঁদের আশঙ্কা, দুধের দাম বাড়লে চায়ের দোকান থেকে মিষ্টির দোকান—সর্বত্রই তার প্রভাব পড়তে পারে। যে পরিবারে প্রতিদিন এক লিটার দুধ কেনা হতো, খরচ সামলাতে তাদেরও বরাদ্দ কমাতে হতে পারে। ফলে দুধের দাম বৃদ্ধি শুধু ক্রেতাদের নয়, দুগ্ধচাষিদের স্বার্থ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
Milk Price Bengal
চুপিসারে দুধের দাম বাড়িয়ে দিল রাজ্য, দুগ্ধচাষিরা সেই তিমিরেই
×
Comments :0