আমেরিকার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাসপ্রথা, বর্ণবিদ্বেষ, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস পেরিয়ে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নির্বাচিত হলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস। মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী তথা ধনকুবের ব্যবসায়ী রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করে তিনি হলেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর। একই সঙ্গে জর্জিয়ার ইতিহাসে প্রথম মহিলা গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব নিতে চলেছেন ৫৬ বছর বয়সি বটমস।
এই জয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকার দীর্ঘ বর্ণবৈষম্যের ইতিহাস, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের লড়াই। যে দেশে একসময় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, সেই দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের শাসনভার এবার এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার হাতে যাওয়ার ঘটনা ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে।
আমেরিকার গণতন্ত্রের ইতিহাস যতটা স্বাধীনতা ও সমতার কথা বলে, তার অন্য একটি অধ্যায় ততটাই নির্মম। ১৭০০ শতক থেকে আফ্রিকা মহাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে জোর করে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। তাদের দিয়ে কৃষিকাজ, বিশেষ করে তুলোর খামার ও অন্যান্য উৎপাদন ক্ষেত্রে দাসের মতো শ্রম করানো হতো। তাঁদের স্বাধীনতা ছিল না, সম্পত্তির অধিকার ছিল না, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকার নিশ্চয়তাও ছিল না। মানুষকে কার্যত পণ্য হিসেবে কেনাবেচা করা হতো।
১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ চলে। দাসপ্রথা বিলোপের প্রশ্ন এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন Emancipation Proclamation ঘোষণা করেন। পরে ১৮৬৫ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমেরিকায় দাসপ্রথার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
কিন্তু দাসপ্রথার অবসান মানেই বর্ণবৈষম্যের অবসান ছিল না। বরং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য নতুন নতুন রূপে সামনে আসে।
বিশেষ করে আমেরিকার দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলিতে চালু হয় 'জিম ক্রো' আইন। এই আইনের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা স্কুল, গণপরিবহণ, রেস্তরাঁ, হাসপাতাল এবং অন্যান্য জনপরিসর তৈরি করা হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার কার্যত সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের Plessy v. Ferguson মামলার রায়ে 'Separate but Equal' বা 'পৃথক অথচ সমান' নীতিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাস্তবে এই পৃথকীকরণের ফলে কৃষ্ণাঙ্গরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হন।
ভোটাধিকার থাকলেও তা প্রয়োগ করা ছিল কঠিন। সাক্ষরতার পরীক্ষা, ভোটকর, প্রশাসনিক বাধা, ভয় দেখানো এবং শারীরিক আক্রমণের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটদান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চলত। ১৮৭০ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বর্ণের ভিত্তিতে ভোটাধিকার অস্বীকার নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে দক্ষিণের বহু এলাকায় সেই অধিকার কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল।
কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারের জন্য মার্টিন লুথার, রোজা পার্কস, ম্যালকম এক্স কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের আত্মমর্যাদা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই দীর্ঘ আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৬৪ সালে Civil Rights Act এবং ১৯৬৫ সালে Voting Rights Act আইনে পরিণত হয়। প্রথম আইনটি বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য ও জনপরিসরে পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যবস্থা নেয়। দ্বিতীয় আইনটি ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে থাকা বৈষম্যমূলক বাধা দূর করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়।
তবে আইন তৈরি হলেও সমাজের গভীরে প্রোথিত বর্ণবৈষম্য একদিনে দূর হয়নি। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পত্তি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং বিচারব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গদের সমান সুযোগের প্রশ্ন আজও আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ জর্জিয়া আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের এমন একটি অঙ্গরাজ্য, যার ইতিহাসের সঙ্গে দাসপ্রথা ও বর্ণবৈষম্যের সম্পর্ক গভীর। একসময় এই রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল রাজ্যের গভর্নরের পদ।
২০০২ সালে সনি পারডিউয়ের জয়ের পর থেকে জর্জিয়ার গভর্নর পদে টানা ২৪ বছর রিপাবলিকানদের আধিপত্য ছিল। সেই রাজনৈতিক ধারায় পরিবর্তন আনলেন কেইশা ল্যান্স বটমস।
আটলান্টার প্রাক্তন মেয়র বটমস এর আগে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি হোয়াইট হাউসের অফিস অফ পাবলিক এনগেজমেন্টের ডিরেক্টর এবং বাইডেনের সিনিয়র অ্যাডভাইজার ছিলেন।
তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিক জ্যাকসন ছিলেন স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত সংস্থা জ্যাকসন হেলথকেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা। নির্বাচনী প্রচারে তিনি কর কমানো, জননিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বটমসের জয় জর্জিয়ার রাজনীতিতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
কেইশা ল্যান্স বটমসের এই জয়কে বুঝতে গেলে স্টেসি আব্রামসের রাজনৈতিক সংগ্রামের কথাও মনে রাখতে হবে।
২০১৮ সালে স্টেসি আব্রামস আমেরিকার কোনও প্রধান রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে গভর্নর পদে মনোনীত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা হয়েছিলেন। ২০১৮ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেও তার প্রচার জর্জিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে।
বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও প্রজন্মের ভোটারদের একত্রিত করার ক্ষেত্রে তার প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। পরবর্তী সময়ে এই রাজ্য থেকেই ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন সেনেটে দুটি আসন জয় করে এবং কয়েক দশক পর ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জর্জিয়ার নির্বাচনী ভোট পান।
আব্রামসের রাজনৈতিক লড়াইয়ের আট বছর পর বটমসের এই জয়কে তাই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘ সংগ্রামের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই নির্বাচনের রাতে আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ অঞ্চল ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন স্টেসি প্লাসকেট। তিনিও কোনও মার্কিন অঙ্গরাজ্য বা মার্কিন অধীনস্থ অঞ্চলের গভর্নর নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছেন।
অন্যদিকে ফ্লোরিডার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকান নেতা বায়রন ডোনাল্ডস। তিনি আমেরিকার ইতিহাসে গভর্নর নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান। ফলে একই নির্বাচনে একদিকে কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নতুন নজির তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের ভিন্ন অবস্থান থেকেও কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বের উত্থান সামনে এসেছে।
আমেরিকার ইতিহাসে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ছিল কৃষ্ণাঙ্গ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। ২০০৮ সালে তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির পৌঁছনো কিংবা কোনও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার নির্বাচিত হওয়া মানেই বর্ণবৈষম্যের অবসান নয়।
কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক অধিকার কখনও সহজে অর্জিত হয়নি। দাসপ্রথা থেকে মুক্তি, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগের দাবি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই লড়াই করতে হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।
কেইশা ল্যান্স বটমসের জয় সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানকে যুক্ত করেছে। যে সমাজ একসময় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছিল, সেই সমাজের একটি অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব এবার সামলাবেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা।
তবে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পাশাপাশি সামনে রয়েছে প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রশ্নও। জর্জিয়ার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, জননিরাপত্তা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলিতে তাঁর সরকার কী পদক্ষেপ করে, সেটাই এখন দেখার।
দাসপ্রথার শৃঙ্খল থেকে ভোটাধিকারের লড়াই, নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছনো কেইশা ল্যান্স বটমসের জয় আমেরিকার ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও অসমাপ্ত সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।
USA Mid term election
দাসপ্রথা, বর্ণবৈষম্য পেরিয়ে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়: আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর হলেন কেইশা ল্যান্স বটমস
×
Comments :0