নরেন্দ্র মোদী যত দিন দেশের নেতৃত্বে থাকবেন, ততদিন বিরোধীরা কোনও নির্বাচনে জিততে পারবে না। মঙ্গলবার শিলিগুড়িতে বিজেপি’র পদযাত্রা শেষে জনসভায় এমনই দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে বিরোধীদের আক্রমণ করতে গিয়ে কমিউনিস্ট, ‘দিমাগি নকশাল’, জেহাদি, আরশোলা, ছাড়পোকা ও মশার মতো শব্দ ব্যবহার করে বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে তাঁদের ‘ঠান্ডা’ করার ডাক দেন তিনি।
সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলগুলি পরাজিত হয়ে দিল্লিতে একজোট হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তারা দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে এবং ভারতকে বিভক্ত করতে চায়। এরপরই তাঁর মন্তব্য, “মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। ক্ষমতায় আসতে গেলে ভোটে জিততে হবে। আর নরেন্দ্র মোদী যতদিন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তত দিন বিরোধীরা কোনও ভোটে জিততে পারবে না।”
বিরোধীদের মোকাবিলায় বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কমিউনিস্ট, দিমাগি নকশাল, জেহাদি জঙ্গি, আরশোলা, ছাড়পোকা, মশা—এদের ঠান্ডা করতে হবে। প্রস্তুত আছেন?” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শিলিগুড়ির আসন্ন পৌরনির্বাচনে বিজেপি’র লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ফলতা, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের নির্বাচনী ফলের প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর দাবি, সরকারে আসার পর তিনটি নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজেপি বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে। ফলতায় ১ লক্ষ ৯ হাজার, নন্দীগ্রামে ১ লক্ষ ২২ হাজার এবং ৭০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগরে ৭৫ হাজার ভোটে জয়ের দাবি করেন তিনি। এরপর বলেন, “ফলতায়, নন্দীগ্রামে, রেজিনগরে যা হয়েছে, এখানেও তাই হবে। চিন্তার কোনও কারণ নেই। প্রথমে কলকাতা, হাওড়ায় সাফ করবো। তার পর শিলিগুড়িতে ঢুকবো।” পাশাপাশি জামাতি তৃণমূল ও নাস্তিক কমিউনিস্টদের থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
এর আগে বাগডোগরা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মাসে দু’বার উত্তরবঙ্গে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। আগামী ১৮ নভেম্বর আলিপুরদুয়ারে ভগবান বিরসা মুণ্ডার জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জনজাতি গৌরব দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ২৪ নভেম্বর কোচবিহারে রাসমেলার উদ্বোধনেও উপস্থিত থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দিল্লি থেকে দলের নির্দেশ রয়েছে। দেশজুড়ে প্রায় ১৩৪টি জায়গায় বিজেপি’র পদযাত্রা হচ্ছে। সেই কর্মসূচির অংশ হিসাবেই এদিন শিলিগুড়িতে মিছিল হয়েছে। তাঁর দাবি, দেশে এখনও গণতন্ত্র রয়েছে এবং মোদীর নেতৃত্বে সুশাসন চলছে। একই সঙ্গে নির্বাচনে পরাজিত ‘দিমাগি নকশাল’, কমিউনিস্ট ও জামাতের বিরুদ্ধে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন তিনি। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকার ‘ঘুসপেটিয়া’দের চিহ্নিত করে সরানোর কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
মঙ্গলবার বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমেই শিলিগুড়ির কাছে উত্তরবঙ্গের শাখা সচিবালয় উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, বিশাল লামা, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিঙের সাংসদ জয়ন্ত রায় এবং রাজু বিস্তা। ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দেন রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য অর্জুন সিং, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার-সহ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা।
বৈঠক থেকে চা বাগান শ্রমিকদের জন্য ‘দীপাবলির উপহার’ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য একাধিক অনুদান ও প্রকল্পের কথাও জানান তিনি।
বিকেলে শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কের সামনে থেকে বিজেপির পদযাত্রা শুরু হয়। কোর্ট মোড়, ভেনাস মোড় ও হিলকার্ট রোড হয়ে মিছিল সেবক মোড় পেরিয়ে এয়ারভিউ মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পদযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পা মেলান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, বিজেপি নেতা লাল সিং আরিয়া-সহ দলের একাধিক মন্ত্রী, সাংসদ ও শীর্ষ নেতৃত্ব। পরে এয়ারভিউ মোড়ের সভায় বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী।
সেখানে চা বাগান ও উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁর দাবি, ২১টি বন্ধ চা বাগানের মধ্যে সামসিং চা বাগান এদিন খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০টি বাগানও খোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের পাঁচ হাজার টাকা এবং ৫০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথাও জানান তিনি। গঙ্গাভাঙন রোধে দিল্লি পর্যন্ত দরবার করেছেন বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
উত্তরবঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রায়গঞ্জে এইমস এবং জলপাইগুড়িতে ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি হবে। বালুরঘাট, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারে মেডিক্যাল কলেজ গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। শিলিগুড়িতে আইআইটি বা আইআইএমের মতো কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিমান পরিষেবা নিয়েও একাধিক ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, হাসিমারা বিমানবন্দরের উদ্বোধন আগামী বছর করা হবে। এর পর কলাইকুণ্ডা, বালুরঘাট ও পুরুলিয়াতেও বিমান পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এই বিমান পরিষেবাগুলির উদ্বোধন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জনসভা শেষে সন্ধ্যায় শিলিগুড়ি পৌরনিগমে যান মুখ্যমন্ত্রী। পৌরনিগমের পুরানো সভাকক্ষে আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শিলিগুড়ি পৌরনিগমের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তৃণমূল পরিচালিত পূর্বতন বোর্ডকে দায়ী করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, পৌরনিগমের পরিকাঠামো মেরামত করতে সময় লাগবে। ৬০০ জন অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীর বেতন ‘ওল্ড ফান্ড’ থেকে দিতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিলিগুড়ির উন্নয়ন নিয়ে যে ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, তা আগে করা হয়নি। বিজেপি কার্যালয়ে সাধারণ মানুষ নানা অভাব-অভিযোগ জানাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পৌরনিগমের আধিকারিকদের একাধিক আইনসম্মত নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আবর্জনামুক্ত শহর, পরিস্রুত পানীয় জল, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং অব্যবহৃত বৈদ্যুতিক খুঁটির মেরামতকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
Suvendu Adhikary Siliguri
‘কমিউনিস্ট, আরশোলাদের ঠান্ডা করতে হবে’এবার শিলিগুড়িতে বিতর্কিত মন্তব্য শুভেন্দুর
×
Comments :0