ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকেই নিশানা করে নয়া শিল্প উৎসাহদান নীতি ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কারখানার গেটে বিক্ষোভ বা কাজ বন্ধের চেষ্টা হলে ১৫ মিনিটের মধ্যে জেলে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে কোনও মালিক কারখানায় লকআউট ঘোষণা করলে সরকারের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী কিছু বলেননি। একইসঙ্গে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্যে ১ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসতে চলেছে বলে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, তাঁর সরকার জমি অধিগ্রহণ করবে না।
গত ১৫ বছরের নিয়ম করে বিজিবিএস (বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট)-এর মঞ্চ থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যেভাবে এরাজ্যে ধর্মঘট করতে দেব না বলে হুমকি দিতেন, প্রায় সেই সুরেই কমিউনিস্টদের নিশানা করলেন শুভেন্দু অধিকারী। হুঙ্কারের সুরে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেছেন, ‘‘কমিউনিস্টদের বলছি, কারখানা গেটে একবার ঝামেলা করে দেখুন। ১৫ মিনিটের মধ্যে জেলে পাঠাবো।’’ কিন্তু মালিকরা লকআউট করলে সরকারের পদক্ষেপ কী হবে, মুখ্যমন্ত্রী তা জানানি।
বৃহস্পতিবার নিউটাউনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের বিজেপি সরকারের নয়া ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোমোশানাল পলিসি’ ঘোষণা করেন। উত্তর ভারতের ‘ধনতেরাস’ উৎসবের দিনটিকেই এরাজ্যের নীতি ঘোষণার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সওয়াল-জবাবের পর মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘‘কমিউনিস্টদের বলুন, কাজ বন্ধ করে দেখতে। কাজ বন্ধ করলে জেলে যেতে হবে। কোনও কারখানা গেটে গিয়ে ঝামেলা করলে জেলে যেতে হবে। জেলে গিয়ে অনেকদিন থাকতে হবে।’’
গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবিএস’র মঞ্চ থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মুকেশ আম্বানি, সজ্জন জিন্দালদের পাশে বসিয়ে বলেছিলেন, ‘‘এখানে একটা স্থায়ী সরকার আছে। আমাদের রাজ্যে কোনোভাবেই শ্রমদিবস নষ্ট হয় না। অতীতে এরাজ্যে নিয়ম করে প্রতিদিন ধর্মঘট, ঘেরাও চলত। কিন্তু শিল্পের স্বার্থে আমরা এসব বন্ধ করে দিয়েছি।’’ মমতা ব্যানার্জির আমলে ৮টি বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলন থেকে ১৬ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল বলে দাবি করা হয়েছিল। সেই বিজিবিএস’র প্রকৃত সাফল্য কোথায়? এদিন শুভেন্দু অধিকারীই জানিয়েছেন, ‘‘তখনও রাজ্যে শিল্প দপ্তরের প্রধান সচিব ছিলেন বন্দনা যাদব। এখনও তিনি ওই পদেই আছেন। তাঁর কাছ থেকে আমি বিজিবিএস’এর তথ্য সংগ্রহ করেছি। তাতে দেখা গেছে ৮টি বিজিবিএস করে সরকারের ৬৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের পরিকাঠামো উন্নয়নের বরাদ্দ অর্থকেও রাজ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে বিজিবিএস’এ বলা হয়েছে।’’ ফলে গত সরকারের আমলে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল টাকা খরচ করেও রাজ্যে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ যে আসেনি তা এখন স্পষ্ট। অথচ প্রতিটি বিজিবিএস’এর সভা থেকে মমতা ব্যানার্জি যেভাবে রাজ্যে ধর্মঘটকে নিষিদ্ধ করার হুমকি দিতেন সেই ভাষাতেই এদিন শ্রমিক স্বার্থে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকেই নিশানা করলেন শুভেন্দু অধিকারী।
এদিন শিল্পে উৎসাহদানের নীতি ঘোষণার করে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। তবে এরাজ্যে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার পথ নিচ্ছে না রাজ্য সরকার। শিল্পের জন্য জমির সংস্থান কীভাবে হবে, সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বন্দুক দিয়ে জমি নেওয়া হয়েছিল। তার পরের মমতা ব্যানার্জির সরকার কোনও জমি নীতি গ্রহণ করেনি। শিল্পপতিদেরই সরকার জমি কিনে শিল্প করতে বলেছিল।’’ নয়া জমি নীতিতে এই দুই পথের মধ্যবর্তী পথ খুঁজে নিচ্ছে রাজ্য সরকার। প্রথম ধাপে সরকার শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সরাসরি জমির মালিকদের কাছ থেকে কিনে নিতে চাইছে। আর দ্বিতীয় পথ হিসাবে অন্ধ্র প্রদেশ, হরিয়ানা, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের মডেল অনুসরণ করে রাজ্য সরকার ল্যান্ড পুলিং পলিসি নিতে চলেছে। যে ব্যবস্থায় জমির মালিকের কাছ থেকে জমি কিনে নেওয়ার পর সেই জমি ‘ডেভেলপ’ করে তার ২৫ শতাংশ আবার কৃষক বা জমির মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। আবার যে জমিতে শিল্প গড়া হবে জমির মালিককে সেই শিল্পের অংশীদার করা হবে।
রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, ‘‘এরাজ্যে এই মুহূর্তে জমি অধিগ্রহণ আইন কার্যকর নেই। নতুন সরকারও জমি অধিগ্রহণ করার পথে হাঁটতে নারাজ। তাই উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, তেলেঙ্গানা সহ বেশ কিছু রাজ্যের ল্যান্ড পুলিং পলিসি মেনে এরাজ্যে শিল্পের জন্য জমি নিতে চাইছে।’’ এছাড়াও সরকারের নিজের হাতে পড়ে থাকা জমিও শিল্পের স্বার্থে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এমনকি গত সরকারের আমলে জমি নিয়ে ফেলা রাখা বিনিয়োগকারীদের তিন মাস সময় দেবে সরকার। সেই সময়ের মধ্যে শিল্পস্থাপন না হলে জমির দাম ফেরত দিয়ে সরকার জমি ফের বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে দেবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ‘‘আমরা জমি অধিগ্রহণ করব না। কিন্তু শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নেওয়া হবে। আমাদের পানাগড়ে অনেক জমি আছে। রাজ্যের বিভিন্ন শিল্প তালুকে জমি পড়ে আছে। ইতিমধ্যেই মিলন মেলায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৩টি শিল্পগোষ্ঠীকে জমি দেওয়া হয়েছে।’’
রাজ্যের শিল্প উৎসাহদান নীতির প্রস্তাব তৈরি করেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রীগোষ্ঠী। সেই প্রস্তাব যায় মুখ্য সচিবের কাছে। এরপর চূড়ান্ত পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে মন্ত্রীসভার বৈঠকে। তার আগে অবশ্য বিজেপি’র রাজ্য সংগঠন ও লঘু উদ্যোগ ভারতী সংগঠনের মতামত নিয়ে সরকার এদিন প্রকাশ করে। তবে এখনই শিল্পে উৎসাহ দান করতে আর্থিক অনুদান দেওয়ার পথে হাঁটছে না রাজ্য সরকার। পরিবর্তে এসজিএসটি, বিদ্যুতের ডিউটি ও ইপিএফ’এর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
Suvendu Industrial Policy
শিল্পের নামে ট্রেড ইউনিয়নকে হুমকি শুভেন্দুর:বিক্ষোভ দেখালে ১৫ মিনিটের মধ্যে জেলে পাঠাবো
×
Comments :0