ক্তধারা
উৎসব ১৪৩৩
প্রবন্ধ
রাজনীতির রঙে জাতীয় পতাকার অবমাননা ও বাংলার বর্তমান দশা : সুকান্ত মন্ডল
৫ নভেম্বর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
রাজনীতি দেশের সব জায়গাতেই আছে, কিন্তু আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির ধরনটা একেবারেই আলাদা। এখানে রাজনীতি শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং পাড়ায় পাড়ায় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে বিভেদ তৈরির এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যেভাবে এখানে রাজনীতির নেশায় একে অপরের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে, তা সাধারণ নাগরিক হিসেবে দেখা কষ্টের। কিন্তু সবথেকে ভণ্ডামি আর নোংরা খেলাটা চলছে আমাদের জাতীয় পতাকার পবিত্র রঙগুলো নিয়ে।রাস্তায় বেরোলে আজ দেখা যায়— একদল বলছে "গেরুয়া চাই", আবার সেই একই দল বলছে "সবুজ হটাউ!" আমার প্রশ্ন হলো, যাঁরা এসব বলছেন তাঁরা কি তেরঙার এই রঙের মর্যাদা জানেন না? গেরুয়া রঙের আসল অর্থ হলো ত্যাগ আর সাহস, আর সবুজ রঙের অর্থ হলো দেশের মাটির উর্বরতা, বিশ্বাস ও বীরত্ব। তেরঙার এই পবিত্র রঙগুলো কোনো ধর্ম বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হতে পারে না। যাঁরা আজ দেশ চালাচ্ছেন বা রাজনীতি করছেন, তাঁরা তো একেক জন বড় পণ্ডিত; তাঁরা কি এই মানেগুলো বোঝেন না? আসলে তাঁরা সব বুঝেও স্রেফ ভোটের লোভে আজ জেনেশুনে আমাদের পতাকাকে নিয়ে দরাদরি করছেন। শহিদ ক্ষুদিরাম বসু যখন ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, তখন কি তিনি গেরুয়াকে ঘেন্না করে আর সবুজকে ভালোবেসেছিলেন? অথবা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও মাস্টারদা সূর্য সেনরা যখন দেশের জন্য লড়াই করেছিলেন, তখন কি তেরঙার রঙগুলোর মধ্যে কোনো বাছ-বিচার ছিল? কক্ষনোই না। একদল যখন অন্য দলকে আক্রমণ করতে গিয়ে পতাকার রঙকে ঘৃণা করতে শেখায়, তখন আসলে তারা আমাদের বিপ্লবীদের ত্যাগ আর আমাদের দেশটাকেই অপমান করে।
সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের সনাতন ধর্মের পবিত্র ‘জয় শ্রীরাম’ মন্ত্রটিকে আজ বিজেপি তাদের 'মূল মন্ত্র' থেকে সরিয়ে 'মূল রাজনৈতিক অস্ত্র' বানিয়ে ফেলেছে। ভক্তির একটা পবিত্র নামকে এভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার ফলে আজ কোটি কোটি সাধারণ বাঙালি এই নাম মুখে নিতেও দ্বিধা বোধ করছেন। ধর্ম কি কোনো দলের কেনা গোলাম? অন্যদিকে ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগান নিয়েও রাজনীতির প্রহসন চলছে। একদল ‘জয় শ্রীরাম’কে অস্ত্র করছে, অন্যদল ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে ভাগাভাগি করছে। আর মাঝখান থেকে সাধারণ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আজ দিশেহারা।
এর পাশাপাশি চলছে পড়াশোনা নিয়ে চরম নোংরামি। স্কুল-কলেজে পড়াশোনা না করিয়েও পাইকারি হারে সবাইকে পাশ করিয়ে দেওয়ার হিড়িক কেন? পড়াশোনা না শিখলে মানুষ প্রতিবাদ করতে পারবে না, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে না— এই উদ্দেশ্যেই কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে? অলিগলিতে মদের দোকান বাড়ছে, অথচ প্রকৃত শিক্ষার কোনো নামগন্ধ নেই।
যাঁরা ক্ষমতার লোভে পতাকার রঙ নিয়ে রাজনীতি করে, ধর্মের পবিত্রতা নষ্ট করে আর শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তাঁরা আর যাই হোক দেশপ্রেমিক হতে পারেন না। রাজনীতির নামে আমাদের রাজ্যে এই আত্মঘাতী খেলা এবার বন্ধ হওয়া উচিত।
Comments :0