দীপাবলি ও ছটপুজোর পর দিল্লিতে বায়ুদূষণের মাত্রা আরও বাড়লে কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা করতে পারে দিল্লি সরকার। সরকারি সূত্রে এমনই ইঙ্গিত মিলেছে। রাজধানীর বাতাসের গুণমান ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে দিল্লির সামগ্রিক বায়ুর গুণমান সূচক বা একিউআই ৩৬৭, যা ‘অত্যন্ত খারাপ’। শহরের একাধিক এলাকায় দূষণের মাত্রা ‘ভয়াবহ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
উত্তর দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সেখানে একিউআই ৪৫৯। অন্যদিকে আইআইটি দিল্লি এবং পাঞ্জাবি বাগ এলাকায় একিউআই রেকর্ড হয়েছে ৪৪৫। দূষণের জেরে দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ঘন ধোঁয়াশায় ঢেকে গিয়েছে রাজধানীর আকাশ। ইন্ডিয়া গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ধোঁয়াশার আড়ালে চলে গিয়েছে। সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছচ্ছে না। শ্বাসকষ্ট-সহ নানা শারীরিক সমস্যার অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই কৃত্রিম বৃষ্টির প্রস্তুতি শুরু করেছে দিল্লি সরকার। গত ১৫ দিনে দু’বার পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম বৃষ্টির প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে বলে সূত্রের খবর। দিল্লি বিমানবন্দরের কাছেও একটি পরীক্ষা চালানো হয়। গত বছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি উচ্চতায় এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সূত্রের দাবি, গত বছর যেখানে প্রায় ১০ হাজার মিটার উচ্চতায় এই প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল, এবার তা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মিটার উচ্চতায়।
মেঘের মধ্যে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ক্লাউড সিডিং বা মেঘ বপন। এক্ষেত্রে সিলভার আয়োডাইড কিংবা ড্রাই আইসের মতো পদার্থ ব্যবহার করা হয়। বিমান, রকেট অথবা ভূমিতে স্থাপিত বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে মেঘের মধ্যে এই পদার্থ ছড়ানো হয়। এর ফলে মেঘের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি বা তুষারপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
জলসংকট, কম তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ কিংবা কুয়াশা কমানোর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। দিল্লির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য বাতাসে ভাসমান দূষণকারী কণাকে নিচে নামিয়ে আনা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বৃষ্টি সাময়িকভাবে দূষণ কমাতে সাহায্য করলেও দূষণের মূল কারণ দূর করতে পারে না।
এনভায়রোক্যাটালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিশ্লেষক সুনীল দাহিয়া আগেই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু ক্লাউড সিডিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। দীপাবলির পরের দিনের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে দূষণ অত্যধিক বেড়ে গেলে এই পদ্ধতি সাময়িকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অন্যদিকে, দীপাবলিতে বাজি পোড়ানো নিয়ে সোমবার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর দিল্লি-এনসিআরে শুধুমাত্র ‘গ্রিন ক্র্যাকার’ বা পরিবেশবান্ধব বাজি পোড়ানো যাবে। দিল্লির দূষণ সমস্যার সমাধান হিসেবে সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করাই একমাত্র পথ কি না, তা নির্ধারণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য আদালতের কাছে নেই বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই ছাড় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ৭ ও ৮ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে ৭টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজি পোড়ানো যাবে। ৯ নভেম্বর থেকে ফের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।
বায়ুদূষণের পরিস্থিতি মোকাবিলায় দিল্লি-এনসিআরে ইতিমধ্যেই গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান বা GRAP-এর দ্বিতীয় পর্যায় কার্যকর করেছে কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (CAQM)।
এই পর্যায়ে একাধিক বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। ধুলো তৈরি হয় এমন নির্মাণ ও ভাঙার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সীমিত ছাড় রয়েছে। জরুরি পরিষেবা ছাড়া ডিজেল জেনারেটর ব্যবহারের উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পাশাপাশি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাস্তা পরিষ্কার এবং জল ছিটানোর কাজ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দীপাবলি ও ছটপুজোর পর রাজধানীর দূষণ পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেই নজর প্রশাসনের। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হলে কৃত্রিম বৃষ্টির মতো সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও, দিল্লির দূষণ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদক্ষেপই যে সবচেয়ে জরুরি, তা ফের সামনে চলে এসেছে।
Delhi Pollution
দীপাবলি ও ছটপুজোর পর দূষণ বাড়লে কৃত্রিম বৃষ্টির পথে হাঁটতে পারে দিল্লি সরকার
×
Comments :0