Post Editorial

নভেম্বর বিপ্লবের বার্তা আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

শ্রীদীপ ভট্টাচার্য
 

নভেম্বর বিপ্লব মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রুশ দেশে স্থাপিত হলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। মার্কসীয় মতবাদের সফল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সফল হলো নভেম্বর বিপ্লব। ‘এতকাল ধরে দার্শনিকরা নানাভাবে দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু মূল কথা হলো একে (বিশ্বকে-লেখক) পরিবর্তিত করা।’ ফয়েরবাখ সংক্রান্ত থিসিসে কার্ল মার্কসের এই ঐতিহাসিক বক্তব্যকে বাস্তবের মাটিতে মার্কসবাদ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নভেম্বর বিপ্লবের নেতা লেনিন,  প্রমাণ করলেন। মার্কসবাদের মর্মবস্তু হলো, ‘নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট অনুশীলন’— লেনিন এভাবেই বিষয়টিকে উপস্থিত করলেন। রুশ দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্টভাবে মার্কসবাদের প্রয়োগ ঘটিয়ে নভেম্বর বিপ্লবকে সফল করলেন।
নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে প্রথম শোষণহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠল।

নভেম্বর বিপ্লবের বিশ্বব্যাপী প্রভাব

নভেম্বর বিপ্লবের বিশ্বব্যাপী প্রভাব অনস্বীকার্য। চীন তথা বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অসাধারণ নেতা মাও-জে-দঙের কথায়, ‘অরোরা যুদ্ধ জাহাজের কামান গর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা অর্থাৎ প্রাচ্যের জনগণ মার্কসবাদের বিপ্লবী তত্ত্বের সাথে পরিচিত হলাম।’
নভেম্বর বিপ্লবের অব্যবহিত পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী পার্টিগুলি গড়ে উঠতে শুরু করে। ভারতেও ১৯১৭-র অব্যবহিত পরে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠল। ভারত তখন ব্রিটিশের অধীন — পরাধীন দেশ। ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ শহরে প্রথম গড়ে উঠল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠল ১৯২০ সালে।

মার্কসীয় মতবাদ ও কমিউনিস্ট পার্টি

পুঁজিবাদী সমাজ হলো চরম শোষণ, নির্যাতন ও বঞ্চনার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থা। পুঁজিবাদ হলো সর্বশেষ শোষণভিত্তিক ব্যবস্থা। সমাজ বিকাশের ধারায় পুঁজিবাদের অবসান ঘটবেই। তবে এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। পুঁজিবাদ সৃষ্ট সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটাতে হবে। সমগ্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব পার্টি — কমিউনিস্ট পার্টি। এই পার্টি বুর্জোয়াদের সমস্ত ধরনের পার্টিগুলির থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ধরনের পার্টি। শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করে, তার পাশে কৃষক সহ সমস্ত শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে জড়ো করে, ধাপে ধাপে সংগঠনকে সংহত করে, বিপ্লবী পরিস্থিতিকে চিহ্নিত করে বিপ্লবী সংগ্রামকে জয়যুক্ত করা— এই লক্ষ্য নিয়েই গড়ে ওঠে কমিউনিস্ট পার্টি। এইরকম প্রকৃত ও উন্নত মানের কমিউনিস্ট পার্টি কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল বলেই রুশ দেশে প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বাস্তবায়িত হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার লক্ষ্যে লেনিনের দুইটি রচনা, ‘কি করিতে হইবে’; এক পা আগে, দুই পা পিছে; আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক রচনা।

কমিউনিস্ট পার্টি ও ভারত

১৯২০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠলেও ব্রিটিশ শাসকরা এ পার্টিকে কখনও বরদাস্ত করতে পারেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ছিল চরম কমিউনিস্ট বিরোধী। শুরু থেকেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে ধ্বংস করার নানা প্রয়াস তারা গ্রহণ করেছিল। বারেবারে এই পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তিন তিনটি ষড়যন্ত্র মামলা যথাক্রমে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা, পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা ও মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা কমিউনিস্টদের দমন করার লক্ষ্যে রুজু করা হয়েছিল। অদম্য জেদ ও সংকল্পকে ভিত্তি করে কমিউনিস্টরা এই ষড়যন্ত্রগুলির মোকাবিলা করেছিল। এই মোকাবিলার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্টদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল দাবি ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’, এটা তো কমিউনিস্টরাই প্রথম উপলব্ধি করেছিল। ভারতের কমিউনিস্টরাই প্রথম সঠিকভাবে বু‍‌ঝেছিল যে শ্রমিক-কৃষক সহ মেহনতি ও গণতান্ত্রিক জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে ব্রিটিশদের পরাস্ত করা ও ভারতের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। ধর্মের নামে ভারত ভাগের বিরোধী ছিল কমিউনিস্টরা। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের ষড়যন্ত্র ও তাতে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের অংশগ্রহণ— একে মোকাবিলা করার শক্তি কমিউনিস্ট পার্টির ছিল না। ভারত ভাগ হয়ে গেল। ভারত ও পাকিস্তান দুইটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো।

স্বাধীন ভারত ও বিপ্লবের রণনীতি

স্বাধীন ভারতের ক্ষমতায় এল বৃহৎ পুঁজিপতিরা। বৃহৎ পুঁজিপতিদের নেতৃত্বে পুঁজিপতি ও জমিদার শ্রেণির যৌথ নেতৃত্ব রাষ্ট্র ক্ষমতায় এল। বৃহৎ পুঁজিপতির নেতৃত্বে ভারত রাষ্ট্র বিদেশি লগ্নিপুঁজির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলল। ভারতে পুঁজিবাদ গড়ে তুলতে গিয়ে সামন্ততন্ত্রের সাথে মৈত্রী গড়ে তুলল।
ভারতে গণতন্ত্রের বিকাশ রুদ্ধ হলো। সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক শোষণ, সামন্তবাদী শোষণ ও পুঁজিবাদী শোষণের অস্তিত্ব এই ভারতে স্বাধীনতার পর থেকে বিরাজ করছে। বিপ্লবী স্তর প্রসঙ্গে মার্কসীয় শিক্ষা অনুসরণ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কর্মসূচিতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবসান ঘটিয়ে ও গণতন্ত্রের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব অর্থাৎ জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সম্পন্ন করতে হবে। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবই আশু বিপ্লব। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে ভারত অগ্রসর হবে।
জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্যের জন্য ভারতীয় সমাজে শ্রেণি শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন প্রয়োজন। বুর্জোয়া দলগুলির রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শ্রমিকশ্রেণি সহ ভারতীয় জনগণকে মুক্ত করতে হবে। বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের কাজকে বর্তমান সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র রাজনৈতিক রণকৌশলগত লাইন হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতে সংসদীয় পথের সুযোগকে যথাসম্ভব ব্যবহার করেই সিপিআই(এম) অগ্রসর হচ্ছে। জনগণের সমর্থনে রাজ্য সরকার পরিচালনার মতো অভিজ্ঞতা সিপিআই(এম) অর্জন করেছে। সংসদীয় পথের সংগ্রামের সাথে সাথে সংসদ বহির্ভূত সংগ্রামও অত্যন্ত গুরুত্ব ও দায়িত্ব সহকারে সিপিআই(এম) পরিচালনা করে চলেছে। ভারতীয় পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগের জন্য সংসদীয় ও সংসদ বহির্ভূত সংগ্রামের সমন্বয় ঘটিয়ে ভারতে জনগণতান্ত্রিক মোর্চা গঠন প্রক্রিয়াকে জোরদার করার লক্ষ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) অগ্রসর হচ্ছে।

আরএসএস-বিজেপি শাসনে ভারত

ভারতের স্বাধীনতার পর ৭৯ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলো। এই সময়কালে বুর্জোয়াদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভারতকে পরিচালনা করেছে। বর্তমানে আরএসএস দ্বারা পরিচালিত বিজেপি দেশের শাসন ক্ষমতায়। ভারতীয় পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগের দলিল সিপিআই(এম) কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, বিজেপি ভারতে অন্যান্য বুর্জোয়া দলগুলির মতো নয়। আরএসএস’র দ্বারা পরিচালিত বিজেপি। হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের নামে এরা ভারতে বিভেদ-বিভাজনের রাজনীতিকে শক্তিশালী করে, প্রসারিত করে।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অর্থাৎ আরএসএস ভারতের মর্মবস্তু অর্থাৎ বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রকে মান্যতা দেয় না। ভারতের সংবিধানকে ওরা মানে না। ভারত মানে হলো, 
‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান
বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।’
ভারতের এই রূপ ওরা স্বীকার করে না। সেজন্যই ২০১৪ সালে ভারত সরকারের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ইতিহাসকে বিকৃত করার লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে ভারতের ইতিহাস চর্চাকে ধ্বংস করতে চাইছে। জোর করে ওরা ভারতবাসীকে বোঝাতে চাইছে যে হিন্দুরা ভারতের আদি মানুষ। এরাই আর্যদের (ইন্দো-ইরানীয়) নাকি প্রকৃত বংশধর।
বিবর্তনের ধারায় আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েনস)-এর আবির্ভাব ঘটে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার বছর পূর্বে (সময়টা অল্প পরিবর্তন হলেও হতে পারে।) আফ্রিকা মহাদেশে। কিছুকাল পর মানুষের পরিযান (Migration) শুরু হয়। ভারতে মানুষের প্রথম পদার্পণ ঘটে প্রায় ৭৫-৮০ হাজার পূর্বে। ভারতে সভ্য সমাজের ইতিহাস ৬-৭ হাজার বছর। আর্যরা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার বছর পূর্বে। অর্থাৎ ভারতে আদি মানুষের অস্তিত্ব বহু হাজার বছর পূর্ব থেকে। সিন্ধু সভ্যতার যুগেও (প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার বছর পূর্বে) এদেশে ধর্মবিশ্বাস ছিল। হরফ গড়তে অসমর্থ থাকার কারণে সেই যুগের ধর্মবিশ্বাস প্রসঙ্গে খুব বেশি জানা যায় না। তবে বৈদিক ধর্মবিশ্বাসগুলির থেকে তা ছিল পৃথক। ধর্ম মানুষকে তৈরি করেনি, মানুষই ধর্মকে সৃষ্টি করেছে।
ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতি যে অংশগ্রহণমূলক (Participatory), এটাও আরএসএস মানে না। অথচ বিশ্বকবি ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, 
‘‘হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য,
হেথায় দ্রাবিড়-চীন,
শক-হুন দল পাঠান মোগল
এক দেহে হলো লীন।’’
হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমদের প্রতি চরম ঘৃণা সঞ্চার করার লক্ষ্যে সক্রিয়। ভারতবাসীর মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস’র কোনও ভূমিকা ছিল না। অথচ ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভাষায়, ‘‘হিন্দুত্ব একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এর ধর্মের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই।’’ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিকল্পিত হত্যা, মিথ্যাকে সত্য হিসাবে উপস্থিত করার প্রয়াস, আরএসএস’র রাজনৈতিক কার্যকলাপের অঙ্গ। স্বাধীন ভারতে পরিকল্পিতভাবে বহু দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে আরএসএস’র নেতৃত্বে। বহু কমিশনের রিপোর্টে আরএসএস’র ঘৃণ্য ভূমিকা উদ্ঘাটিত। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা করার ঘটনা সম্পর্কে সকলে অবগত।
বর্তমানে এসআইআর (SIR)-এর নামে কোটি কোটি ভারতবাসীর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র আরও বেশি করে উদ্ঘাটিত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের বক্তব্যে। কোটি কোটি ভারতবাসী যাদের নাগরিকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে SIR-এর মধ্য দিয়ে, তাদের এক অতি উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী।
বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রচারমাধ্যম, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠাগুলিকে দখল করার উন্মত্ত অভিযানে নেমেছে আরএসএস-বিজেপি।
প্রকৃতি ও মানব সমাজের মধ্যে কার্যকর নিয়মাবলীকে জানাই তো বিজ্ঞান।  প্রকৃতি জগৎ ও মানব সমাজ সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে চলেছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের অগ্রগতি কুসংস্কার-কূপমণ্ডুকতা-গোঁড়ামি-ধর্মান্ধতা-মৌলবাদকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করছে। আরএসএস বিজেপি সরকারকে ব্যবহার করে বিজ্ঞানকে দুর্বল করে ছদ্ম বিজ্ঞানকে স্থাপন করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বিজ্ঞানের নামে কুসংস্কার-মতান্ধতাকে প্রতিষ্ঠা করাই ছদ্ম বিজ্ঞানের লক্ষ্য। ছদ্ম বিজ্ঞানকে যুক্তিবাদকে দুর্বল করার জন্যই শক্তিশালী করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্ণধাররা কিভাবে অতি নিপুণতার সাথে এই কাজ করছে তা প্রতিদিন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পৌরাণিক কাহিনিকে ইতিহাস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা এই ছদ্ম বিজ্ঞানের অঙ্গ। পুরাণের রাম, পুরাণের হনুমান এদের প্রতি কোনও অসম্মান প্রদর্শন না করেও বলা যায় এনাদের নাম ব্যবহার করে একদিকে ছদ্ম বিজ্ঞান, অপরদিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। এ রাজ্যের আরএসএস-বিজেপি সরকার শারদোৎসবের সময়ে প্রগতিশীল ও মার্কসীয় মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে কিভাবে বাধা তৈরি করেছে সকলে প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রগতিশীল চিন্তাকে এরা ভয় পায়।
আরএসএস-বিজেপি ভারতের বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে কাজ করে চলেছে। এদের অনুসৃত নীতি আদানি-আম্বানিদের আরও পুষ্ট করছে। বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে এদের নীতি প্রণীত হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি জনগণের জীবন ক্রমান্বয়ে বিপর্যস্ত করছে। বেকারি, দারিদ্র, বৈষম্য সমগ্র দেশজুড়ে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কয়েকজন বিলিয়নেয়ারের অস্তিত্ব যেমন রয়েছে, অসহনীয় দারিদ্রের শিকার প্রায় ১০০ কোটি ভারতবাসী, এটাও প্রত্যক্ষ করা যায়। বঞ্চিত, ক্ষুধার্ত, শোষিত ভারতবাসী, বিশেষ করে শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুর সহ পশ্চাৎপদ অংশের ধারাবাহিক সংগ্রামও প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। সংগ্রামের অধিকার কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদীর সরকার লেবার কোডের মতো ভয়ঙ্কর গণতন্ত্রবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ভারতে নয়া ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে ক্রমান্বয়ে তৎপরতা মোদী-অমিত শাহরা প্রদর্শন করছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে এদের সখ্যতা

কর্পোরেট-হিন্দুত্বের মেলবন্ধনের এই সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জুনিয়র পার্টনারের পরিচিতি পেতে বদ্ধপরিকর। ট্রাম্পের শাসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে আগ্রাসী অভিযান পরিচালনা করছে তার বিরুদ্ধে আরএসএস-বিজেপি সরকারের কোনও প্রতিবাদী ভূমিকা নেই। কখনও ইজরায়েলকে সামনে রেখে প্যালেস্তাইন, লেবাননের ওপর আগ্রাসন, কখনও সরাসরি ইরান, ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী অভিযান— শান্তি, গণতন্ত্র রক্ষার্থে আরএসএস-বিজেপি সরকারের বিন্দুমাত্র ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

সমাজতন্ত্র অপ্রতিরোধ্য

১৯৯০-৯১ সালে পূর্বতন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে। ওই বিপর্যয়ের পর বিশ্বের পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকরা সমস্বরে বলে ওঠেন, “End of History” (অর্থাৎ ‘‘ইতিহাসের শেষ’’)। সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের বিকল্প নয়, তা প্রমাণিত। বিশ্বের সংগ্রামী কমিউনিস্টরা সেদিন সমস্বরে বলেছিলেন, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানব সমাজে শোষণের অবসান ঘটবেই। বিজ্ঞানকে অবলম্বন করে মানব সমাজের বিকাশের এই বিশ্লেষণ অভ্রান্ত। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। মার্কসীয় বিপ্লবী মতাদর্শ থেকে যে মারাত্মক বিচ্যুতি রুশ দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল, তার পরিণতিতে ওই সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রতিবিপ্লবী শক্তি ভীষণভাবে মাথাচাড়া দেয়। অপরদিকে মতাদর্শগত বিচ্যুতির পরিণতিতে শ্রমিক শ্রেণির প্রধানতম হাতিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রাণভোমরা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা শুধু দুর্বল হয় না, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রতিবিপ্লবীরা পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ এই সুযোগ গ্রহণ করে। প্রতিবিপ্লব সফল হয়। সমাজতন্ত্রের বিপর্য‌য় ঘটে।
এই প্রতিবিপ্লবের সঠিক বিশ্লেষণ করে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন সেদিন আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছিল, শোষণভিত্তিক, সমস্যা সঙ্কুল পুঁজিবাদ কখনও বিকল্প নয়, মানব সমাজের উন্নততর ভবিষ্যতের জন্য সমাজতন্ত্রই বিকল্প।
বিশ্বের প্রধান চারটি সামাজিক দ্বন্দ্বের কথা বহুদিন পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছিল। দ্বন্দ্বগুলি হলো যথাক্রমে — ১) সাম্রাজ্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্র; ২) সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব; ৩) সাম্রাজ্যবাদ বনাম উন্নয়নশীল দেশগুলির জনগণের দ্বন্দ্ব এবং ৪) পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব। সমাজতন্ত্র বনাম সাম্রাজ্যবাদ, এই দ্বন্দ্বটিকে এ যুগের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব বলা হয়। এ দ্বন্দ্বের সমাধান ঘটবে যখন সাম্রাজ্যবাদ চূড়ান্তভাবে পরাজিত হবে এবং বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র বিজয়ী হবে। বাকি দ্বন্দ্বগুলির কোন কোনটি এক এক সময়ে সামনে আসবে, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই এটা ঘটাবে। যতই বাগাড়ম্বর করুক পুঁজিবাদের সঙ্কট ক্রমাগত তীব্রতর হচ্ছে। ২০০৮ সাল থেকে তৈরি হওয়া তীব্র মজার সঙ্কট থেকে বিশ্ব পুঁজিবাদ মুক্ত হতে সক্ষম হচ্ছে না, হাজার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। দারিদ্র, শোষণ, বঞ্চনা, বেকারি, বুভুক্ষা বিশ্ব জুড়ে এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সমস্ত পুঁজিবাদী দেশে সঙ্কটগুলি তীব্রতর রূপ নিচ্ছে। ভয়াবহ সঙ্কট শ্রমজীবী জনগণ সহ নাগরিকদের প্রতিবাদী আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পুঁজিবাদ নয়, মানব সমাজের একমাত্র ভবিষ্যৎ সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যপথে প্রতিবাদী আন্দোলনগুলিকে পরিচালনা করা বর্তমান সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের হাজার প্রয়াস সত্ত্বেও সমাজতন্ত্র নতুন আকর্ষণ নিয়ে একমাত্র বিকল্প পথের সন্ধান দিয়ে শক্তিশালী রূপে উপস্থিত হচ্ছে।
শোষণভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তথা সর্বহারার রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে বিশ্বের অগ্রসর হওয়ার বার্তা তো নভেম্বর বিপ্লবই প্রথম উপস্থিত করেছিল।
চির অমলিন নভেম্বর বিপ্লব
মানব সমাজে যতদিন শোষণ ব্যবস্থা থাকবে, নভেম্বর বিপ্লবের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা বিরাজ করবে। পুঁজিবাদ সহ অন্যান্য সমস্ত ধরনের শোষণ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো ও সেই লক্ষ্যে সর্বহারার নেতৃত্বে সমাজ বিপ্লবের বার্তা যেমন নভেম্বর বিপ্লব উপস্থিত করল, সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব বিপ্লবী পার্টির প্রয়োজনীতা ও ভূমিকার বার্তা ও এই বিপ্লব উপস্থিত করল। পুঁজিবাদের পতন ও সমাজতন্ত্রের বিজয় — এটা অনিবার্য। নভেম্বর বিপ্লবের এই চির অমলিন বার্তাই এই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বের মেহনতি ও গণতান্ত্রিক জনগণের সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা।

 

Comments :0

Login to leave a comment